সংশোধিত আরপিওতে ছোট দলগুলো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নিবন্ধিত দল জোট করলেও নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে এমন বিধান রেখেই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। জোট মনোনীত প্রার্থীকে নিজ দলের প্রতীকে ভোট করা নিয়ে বিএনপি জোট আপত্তি তুললেও জামায়াত ও এনসিপি ২০ ধারার এ সংশোধন বহাল রাখার দাবি জানায়। এ নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যেই সেই বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন এই সংশোধনীর কারনে ছোট দলগুলো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জোট করার ক্ষেত্রে আগ্রহ কমে যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সময় কোনো একটি দলের প্রতীক নিলে তাতে দলগুলোর ভোটের প্রকৃত চিত্র লিপিবদ্ধ করা যায় না। এক্ষেত্রে নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করলে দলগুলোর ভোটের সংখ্যা যথাযথভাবে উঠে আসে।
সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একাধিক নিবন্ধিত দল জোট করলেও জোট মনোনীত প্রার্থী বড় দলের বা অন্য দলের প্রতীকে ভোট করতে পারবে না, নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে। এর আগে ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার পর এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বিএনপি। দলটি নির্বাচন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে তাদের আপত্তির কথা তুলে ধরে। এরপর সরকার বিষয়টি বাদ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিলে শেষ পর্যন্ত ওই বিধান রেখেই অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটে ভোট করলেও নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় ভোটের হিসাব-নিকাশে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি দলীয় জোট। অন্যদিকে কিছুটা লাভবান হবে জামায়াতসহ তার মিত্র দলগুলো। কারণ ছোট দলগুলো বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হলেও ‘ধানের শীষ’ প্রতীক না পেলে ছোট দলের অনেক প্রার্থীর জয় পাওয়া অনেকটা কঠিন হবে। অন্য দিকে জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপি আসন ছাড় দিলেও দলের কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলে জোটের শরিক দলের প্রার্থীর ভোটে জেতা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলিম বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিধান করার সুপারিশ করেছিল। ছোট দলগুলোকে নিয়ে একতরফা নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা কিংবা বড় দলগুলোকে ব্যবহার করে ছোট দলের সুবিধা নেওয়ার যে চর্চা, গত কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে আরপিও সংশোধনীর পর নতুন ব্যবস্থায় তার অবসান ঘটাতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, একটা দলের নিজস্ব আদর্শ, গঠনতন্ত্র, প্রতীক নিয়ে জনগণের কাছ যাবে বলেই তারা কমিশনের কাছ থেকে নিবন্ধন ও প্রতীক নেয়। কিন্তু জোটের বড় দলের প্রতীকে করলে সেটা হয় না। জোটের বড় দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা অনৈতিক।
আরপিওতে উল্লেখ যোগৎ্য যে সব পরিবর্তন:
২ নম্বর ধারায় এ সংশোধন এনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর নাম যুক্ত করা হয়েছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের ভোটে এমন বিধান ছিল। গত তিন নির্বাচনে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় ছিল ছিল সশস্ত্র বাহিনী। এবার সংশোধন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হতে পারে। ৮ নম্বর ধারা পরিমার্জন করে ভোটকেন্দ্র (পোলিং স্টেশন) প্রস্তুতের ক্ষমতা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার হাতে রাখা হয়েছে।
৯ নম্বর ধারা পরিমার্জন করা হয়েছে; রিটার্নিং অফিসার কোনো ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করলে তা ইসিকে অবহিত করতে হবে। ১২ নম্বর ধারায় যুক্ত করা হয়েছে কোনো আদালত ফেরারি বা পলাতক আসামি ঘোষিত হলে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবে। ফলে পলাতক আসমি প্রার্থী হতে পারবেন না এবার। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা অন্য কোনো পদে থাকলে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন। প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য সংক্রান্ত হলনামায় অসত্য তথ্যের প্রমাণ পেলে ভোটের পরেও ইসির ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।
১৩ নম্বর ধারায় প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া জামানতের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগে এর পরিমাণ ছিল ২০ হাজার টাকা। ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, রিটার্নিং কর্মকর্তার আদেশে ক্ষুব্ধ হলে প্রার্থী বা ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোনো সরকারি সেবাদানকরী প্রতিষ্ঠানও আপিল করার সুযোগ পাবে। ১৯ নম্বর ধারায় ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কোনো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী যদি একজন থাকে, তাহলে ব্যালট পেপারে ‘না’ ভোটের বিধান থাকবে। তবে দ্বিতীয়বার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘না’ ভোট থাকবে না। ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের জোটগতভাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ২১ নম্বর ধারা পরিমার্জন করে বলা হয়েছে নির্বাচনী এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ভোটার হতে হবে। ২৭ নম্বর ধারায় পোস্টাল ভোটিংয়ের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। প্রবাসী, সরকারি চাকরিজীবি ও দেশের ভেতরে আটক ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার বিধান করা হয়েছে।
৩৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ভোটের দিন প্রিজাইডিং অফিসারের বাতিল করা সব ভোট কেন্দ্রে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়; বিধায় বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে ‘তিনি প্রয়োজন মনে করলে গণনা করতে পারবেন’ বিধানটি যুক্ত করা হয়েছে।
৩৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সমভোট পেলে লটারির পরিবর্তে পুনঃভোট করা যাবে। আগে সমভোট প্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে লটারি করে একজনকে নির্বাচিত করার বিধান ছিল। ৯১ নম্বর ধারায় অনিয়মের জন্য কেন্দ্রের ভোট বাতিলের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে পুরো নির্বাচনি এলাকার ফল বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ইসিকে।
আরপিও সংশোধনী করায় নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার পথ মসৃণ হবে বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলি। তবে ‘না’ ভোট বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, সাধারণ নির্বাচনে ব্যালট পেপারে এক অংশের জন্য ‘না’ ভোট থাকবে, আরেক অংশের জন্য থাকবে না এতে অনেকে বিভ্রান্ত হবে। ‘না’ ভোট থাকলে জানা মাত্র বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার কথা যেসব প্রার্থীর, তাদের বিপক্ষে এক বা একাধিক ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করানো হতে পারে। এতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করেই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করায় ক্ষোভ জানিয়েছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আরপিও চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির আলোচনা জরুরি ছিল। ইসি এখনো ভালো করে জানেই না দেশে রাজনৈতিক দল কারা, আর তাদের ভাবনা কী। দলের সঙ্গে আলোচনা না করে আরপিও চূড়ান্ত করায় ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসলে আরপিও নিয়ে প্রশ্ন আসবে। আর তখন আবার সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।







