সংবিধানে স্বয়ংক্রীয় ভাবেই যুক্ত হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সংসদে অনুমোদনের প্রয়োজন নেই

 

রফিকুল ইসলাম সবুজ:
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করার রায়কে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছিল ১১ মাস আগে। পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও তা করা যায়নি আইনী জটিলতার কারনে। সংবিধানের যে সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, সেই ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আবেদনের নিষ্পত্তির জন্য এতো দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার আপীল বিভাগ রিভিউতে (পুনর্বিবেচনা) ত্রয়োদশ সংশোধনী ‘বাতিলের রায়টি’ বাতিল করে দেওয়ায় এখন সংবিধানে স্বয়ংক্রীয় ভাবে ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আইনবিদরা জানান, রিভিউতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়টি বাতিল হয়ে যাওয়ায় এখন সরকারের গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল হবে এবং নতুন করে সংবিধান ছাপাতে হবে।
আইনবিদরা বলেন, আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়ায় সংসদে এটি নতুন করে আর দুই তৃতীয়াংশ ভোটে অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। যেমনটি সম্প্রতি এক রায়ে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ করা যাবে’ সংবিধানের এ-সংক্রান্ত ৯৬ অনুচ্ছেদ পুরোটাই পুনর্বহাল করেছেন আপিল বিভাগ। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ থেকে ৮ পর্যন্ত বিধান ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল। এগুলো পুনর্বহাল করে আপিল বিভাগ রায় দেওয়ায় তা সংবিধানে স্বয়ংক্রিভাবে পুন:স্থাপিত হবে।
১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ ভাগের ২ক পরিচ্ছেদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, সংসদ ভেঙে গেলে বা মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। এই সরকারের মেয়াদ হবে নতুন প্রধানমন্ত্রী কার্যভার গ্রহণ করা পর্যন্ত। প্রধান উপদেষ্টা ও অনধিক ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। আর প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। যদি তিনি সম্মত না হন, তবে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের মধ্য থেকে বয়সে জ্যেষ্ঠতম যিনি, তিনি হবেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনিও সম্মত না হলে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে বয়সে জ্যেষ্ঠতম জন প্রধান উপদেষ্টা হবেন। যদি এই পদ্ধতিগুলো ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে অগ্রসর হবেন। প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক অনধিক ১০ জন উপদেষ্টাকে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করা হতো। যদি কোনো প্রক্রিয়াতেই প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সম্ভব না হতো, তবে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান ছিল। আর উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতায় বলা ছিল, একজন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে তাঁর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গসংগঠনের সদস্য হবেন না। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন না মর্মে লিখিতভাবে সম্মত হতে হতো। আর প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টাদের বয়স ৭২ বছর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। আর সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বভার গ্রহণ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি ঘটবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় রিভিউ চেয়ে আবেদনকারিদের আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভুইয়া বলেন, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সম্বলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে যে রায় দিয়েছিলো সেই রায়টি বাতিল করার জন্য রিভিউ আবেদন করা হয়েছিল। উচ্চ আদালত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়টি বাতিল করে দেওয়ায় সংবিধান তার পূর্বের অবস্থায় স্বয়ংক্রীয় ভাবে ফিরে এসেছে অর্থাৎ সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে। এজন্য সংসদের আর কোন অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। ড. শরীফ ভুঁইয়া বলেন, আদালতকে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনীর মামলার নজির দেখিয়েছি। এটা আমাদের প্রতিষ্ঠিত আইনে আছে যে, কোনো কিছু বাতিল হলে আগেরটা আপনা আপনিভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে। যদি আদেশের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হয় তাহলে সংসদের ক্ষমতা খর্ব হবে না। তবে বর্তমান নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকার করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এর পরের নির্বাচন অর্থাৎ চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।
ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে রিট করেছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় রিভিউ চেয়েও আবেদন করেন তারা। হাইকোর্ট গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। সুুপ্রিম কোর্টের আইনীজীবী ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসিম বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষনা করে হাইকোর্ট এই সংশোধনী বাতিল করায় সংবিধান পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে এটাই নিয়ম। কিন্তুু আপীল বিভাগে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় এতো দিন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরেনি। এখন আপীল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় বাতিল কওে দেওয়ায়  সরকার এবিষয়ে একটি গেজেট নোটিফিকেশন জারি করলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রীয় ভাবে ফিরে আসবে।
সুুপ্রিম কোর্টের আরেক সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আদালতে রায়ে সংবিধানে তত্ত্ববধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হলেও তা এখন কার্যকর করা সম্ভব না। কারণ যে সিস্টেমে এটা প্রয়োগ করতে হয়, সেটি সংসদ বহাল থাকা অবস্থায়। বর্তমানে দেশে সংসদ কার্যকর নেই তাই সংসদ ভাঙারও কোনো প্রশ্ন নেই। সংসদ না ভাঙলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ নেই। ফলে এবার অন্তর্বর্তী সরকারের অধিনে নির্বাচন হবে। তার মতে নির্বাচনের পর নতুন সংসদের সিদ্ধান্তে যদি আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগের মতোই থেকে যায় অথবা নতুন করে জুলাই সনদে উল্লিখিত ম্যাকানিজম যুক্ত করা হয়, তাহলে সেই পদ্ধতিতে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক কার্যকর হবে।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের চাপে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস করে বিএনপি সরকার। এর দুই বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়। পরে ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার আমলে সেই রিট খারিজ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকসহ সাত বিচারপতির আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। পরে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসহ সংবিধানে বেশ কিছু পরিবর্তন আনে আওয়ামী লীগ।

##