রেলওয়েতে টিকে এন্টারপ্রাইজের অনিয়ম তদন্তের নির্দেশ মন্ত্রনালয়ের
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ রেলওয়ের মালামাল সরবরাহে কানাডার সিমর ইন্টারন্যাশনাল সলিউশনস লিমিটেড এবং তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি টিকে এন্টারপ্রাইজ এর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তের জন্য অবশেষে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে ভুয়া ঠিকানা দিয়ে লাইসেন্স করা এবং নিম্নমানের ও নষ্ট পণ্য সরবরাহের কারনে রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতি করার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া টিকে এন্টারপ্রাইজের মালিকের বিরুদ্ধে খন্দকার বিল্ডার্স, দা জায়ান্ট এন্টারপ্রাইজ ও বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড টেকনিক্যাল সার্ভিস নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স ও নিবন্ধন চট্টগ্রামে রেল কর্মচারীদের বরাদ্দকৃত আবাসিক ঠিকানায় দেখানো হয়েছে যা নিয়ম বহির্ভূত। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের পর তা মন্ত্রনালয়কে জন্য গত ১৪ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সহকারি সচিব দিপন দেবনাথ স্বাক্ষরিত পত্রে রেলওয়ের মহাপরিচালককে নির্দেশনা দেওয়া হয়। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং ষ্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী জানান, অভিযোগগুলো গুরুত্বর। মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
রেলপথ মন্ত্রনালয়ের কাছে আসা অভিযোগে বলা হয় সিমর ইন্ডাস্ট্রিয়াল সলিউশনস লিমিটেড ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বলে উল্লেখ করা হলেও, ফেডারেলভাবে কানাডাতে সাময়িক ভাবে নিবন্ধিত ছিল। তবে ২০০৮ সাল থেকেই দীর্ঘদিন কোম্পানির কোথাও কোনো আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম ছিল না। এমনকি কানাডিয়ান সরকারের কোম্পানি নিবন্ধনকারী সংস্থার রেকর্ড ও নথিতে এই কোম্পানিটি ২০১৬ সাল অবধি সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছিল না। অফিসিয়ালভাবে কোম্পানিটি পুনঃনিবন্ধিত হয় ২০১৬ সালের ২০ জুন, ৫০০ ডাফারিন, টরেন্টো, অন্টারিও, কানাডা ঠিকানায়। এই নিবন্ধনের তথ্য কানাডিয়ান সরকারের কোম্পানি নিবন্ধনকারী সংস্থার ইস্যুকৃত নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। ওই কোম্পানিটি ২০১৬ সালের ২০ জুন উল্লেখিত টরেন্টোর ঠিকানায় নতুনভাবে নিবন্ধিত হওয়ায় তার আইনি ও ব্যবসায়িক সকল কার্যক্রমের শুরুও হয় সেই তারিখ থেকে। সেক্ষেত্রে সিমর এর এইসব তথ্য গোপন করে বা ঘষামাজা করে, ২০১৬ সালের বাংলাদেশ রেলওয়ের আহবানকৃত বিদেশি যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এনলিস্টমেন্টের দরপত্র নং পি ৬/ ডিএসএল/সাপ্লাইয়ার/ এনলিস্টমেন্ট /২০১৬ – এ অংশ নিয়ে পরবর্তীতে অফিসিয়ালভাবে তালিকাভুক্তি হওয়া নিয়ম লঙ্ঘনের শামিল। এই প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন নথিতে উল্লেখিত ঠিকানা এবং অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া ও বাংলাদেশ রেলওয়েতে নিবন্ধিত ঠিকানা ভিন্ন ছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। উক্ত কোম্পানির নর্থ আমেরিকায় রেল সংক্রান্ত কোনো ব্যবসায়িক বা সরবরাহ রেকর্ড নেই।
তাছাড়া সিমর ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিনিধি টিকে এন্টারপ্রাইজ যার অলিখিত মালিক তারিকুল ইসলাম তারেক খন্দকার বলে সংস্লিষ্টরা জানান। ট্রেড লাইসেন্স নিবন্ধনে তারেক খন্দকারের মা কল্পনা বেগম মূল মালিক। প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স ও নিবন্ধন চট্টগ্রামে রেল কর্মচারীদের বরাদ্দকৃত আবাসিক ঠিকানায় দেখানো হয়েছে যা নিয়ম বহির্ভূত। স্থানীয় এজেন্ট তারেক খন্দকার পরিচালিত একটি সিন্ডিকেট রেলওয়ের যন্ত্রাংশ ক্রয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সিন্ডিকেটের সহযোগী রবিউল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, ইকবাল হোসেন চৌধুরী নামে-বেনামে কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে রেলওয়ের একজন পরিচালক বেনামে ব্যবসায়ীক পার্টনার বলে জানা গেছে। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয় টিকে এন্টারপ্রাইজের ট্রেড লাইসেন্স নিবন্ধনে তারেক খন্দকারের মা কল্পনা বেগম মূল মালিক হলেও বাস্তবে তাকে রেল সংশ্লিষ্ট কেউ কোনদিন দেখেননি। এমনকি রেলের সাথে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরেও তিনি কোনদিন উপস্থিত হয়নি, তারপরও প্রতিটি মালামাল সরবরাহের চুক্তিতে তার স্বাক্ষর দেখা যায় এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নামেই এলটিএম পদ্ধত্তিতে অনিয়মের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালামাল সরবরাহ করার সর্বোচ্চ সংখ্যক কার্যাদেশ প্রাপ্তি স্বাপেক্ষে বিগত বছরগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক এর স্বাভাবিক দাপ্তরিক কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে জানানো হয় এনলিস্টমেন্টের দরপত্র গত ৩০ নভেম্বর উন্মুক্ত হলেও পিপিআর বিধামালা ২০২৫ অনুযায়ী ২৪ ঘন্টার মধ্যে দরপত্র মূল্যায়ন করে তা চূড়ান্ত করে জমা দিতে হয়। কিন্তু ৯ দিন অতিবাহিত হলেও অজ্ঞাত কারণে দরপত্র মূল্যায়ন সংক্রান্ত কোন পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। দরপত্র ওপেনিং কার্যক্রম টানা ৯ দিন আটকে রাখে এই সিন্ডিকেট। পরে চাপের মুখে গা বাঁচাতে রেল কর্মকর্তারা পিছনের তারিখে সাক্ষর করেন এবং দরপত্র ওপেনিং রিপোর্ট চূড়ান্ত করে বিষয়টি ধামাচাপা দেন। এ ঘটনায় সাধারণ ঠিকাদার ও রেল কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্ট হয়। দরপত্রে মোট ৫৪ টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে সময়মতো দরপত্র জমা দিলেও তারেক খন্দকার সিন্ডিকেটের চিহ্নিত ৬ জন সময়মতো দরপত্র জমা না দিয়ে হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
তবে অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে সিমর ইন্টারন্যাশনাল সলিউশনস লিমিটেড এর স্থানীয় প্রতিনিধি টিকে এন্টারপ্রাইজ এর কর্ণধার তারিকুল ইসলাম খন্দকার তারেক বলেন, তাদের কোন সিন্ডিকেট নেই। সবাই আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের মালিক। একটি মহল তাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভাবে অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করছে। সিমর ইন্টারন্যাশনাল সলিউশনস এর সব ডকুমেন্ট ঠিক আছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশে রেলওয়ের মালামাল সরবরাহ করে। সরকারি কলোনীতে নিজেদের ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা প্রসঙ্গে বলেন তার বড় ভাইয়ের বাসা ছিল একারনে ঐ ঠিকানায় লাইসেন্স করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং ষ্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের জন্য মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর রেলওয়ের মহাপরিচালক তাকে ফাইল তুলতে বলেছেন। তদন্ত কমিটিতে কে কে থাকবেন তা ঠিক করে দু’একদিনের মধ্যেই কমিটি গঠন করা হবে।
##







