বিএনপির টার্গেট ২০০ আসনে জয়, শরিকদের ছাড়তে পারে ৪০ আসন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি ২৩৬টি আসনে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করার পর দেশে নির্বাচনী আমেজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। বাকি ৬৪টি আসনের মধ্যে জোট শরিকদের জন্য ৪০টি আসন ছেড়ে দেওয়া নিয়ে চলছে আলোচনা। বিএনপির একাধিক নেতা জানান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৬০ আসনে প্রার্থী দিয়ে বিএনপি একক ভাবে ২০০ আসনে জয় পেতে চায়। এছাড়া জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়া ৪০ আসনের মধ্যে ১০ থেকে ১২ টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিকল্পনা নিয়েই নির্বাচনী প্রচার শুরু করছে দলটি। ৭ নভেম্বর থেকে সারা দেশে প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারনা শুরু করেছেন।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, জোট শরিকদের জন্য প্রাথমিকভাবে ৪০টি আসনের কথা ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী নির্বাচনী জোট হলেও নিজস্ব মার্কায় নির্বাচন করতে হবে। একারনে জোটের শরিক দলগুলোকে আসন ছাড় দিলেও তাঁরা নির্বাচিত হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আবার শরিক দলগুলো যেসব আসন চায় সেখানে বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থী আছেন। তাঁরা দীর্ঘদিন হামলা, মামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ত্যাগের বিষয়টিও বিবেচনা করছে বিএনপি। ফলে এনসিপি যদি জোটে আসে তাহলে ৪০টি আসন ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে এনসিপিকে ২০ টি এবং অন্যদের ৩০টি আসন ছাড়া হতে পারে। তবে এনসিপি না এলে জোট শরিকদের আসন ৩০ এর মধ্যেই রাখতে চাইছে বিএনপি।
বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনে যেসব দল আলোচনায় আছে সেগুলো হলো লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ এলডিপি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণফোরাম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সমমনা দল, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, বাংলাদেশ লেবার পার্টিসহ একাধিক দল। এ ছাড়া এনসিপি নেতাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বিএনপির।
বিএনপি নেতারা জানান, নিজস্ব মার্কায় নির্বাচন করতে হবে বলে জোটের জন্য আসন ছাড় নিয়ে আরো বেশি ভাবতে হচ্ছে। আর শরিক দলের প্রার্থীদের আসন ছাড় দেওয়ার পর যদি ওই এলাকার বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁদের পক্ষে জোরালোভাবে মাঠে না নামেন তাহলে তাঁদের পক্ষে জিতে আসা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে জোটের আসনসংখ্যা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। যদি এনসিপির সঙ্গে জোট হয় তাহলে বিএনপি জোটে সবচেয়ে বেশি আসন তাদেরই ছাড় দেওয়া হবে। তবে জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতায় আরো সময় লাগবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিল সেসব শরিক দলের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। এখনো যেসব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি সেগুলোর কিছু আসন শরিক দলগুলোকে দেওয়া হবে। আর কিছু আসনে এখনো বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। কবে এসব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
শরিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীরা যেসব আসন থেকে নির্বাচন করতে চান সেখানে এখনো কোনো প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। শরিক দলের অনেকেই বিএনপির গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাঁরা আগে থেকেই নির্দিষ্ট কিছু আসনে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আরপিও সংশোধনের পর অনেকে তাঁদের নিজস্ব মার্কা নিয়েই প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে জোটের যেসব দলের নিবন্ধন নেই সেসব দলের নেতারা ধানের শীষ নিয়েই নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন।
ঢাকা-১৭ আসনে গরুর গাড়ি মার্কা নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপির শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। ঢাকা-১৩ আসনে প্রচারণা চালাচ্ছেন এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। ওই দুটি আসনেই বিএনপি এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর তাঁর নিজ এলাকা পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে নির্বাচন করতে এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরে গণসংযোগ চালাচ্ছেন। ২০২২ সাল থেকে বিএনপি যে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছিল তাতে যুক্ত ছিল গণঅধিকার পরিষদও। এই আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। একইভাবে দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান নির্বাচন করতে চান ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে। এই আসনেও বিএনপি প্রার্থী দেয়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে বিএনপির জোটের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির। ওই আসনেও দলীয় কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি বিএনপি। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমদের ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক চট্টগ্রাম-১৪ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। বগুড়া-২ আসনে প্রার্থী হওয়ার কথা রয়েছে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার। পিরোজপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র সাহাদাত হোসেন সেলিমের প্রার্থী হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদার প্রার্থী হওয়ার কথা রয়েছে। ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। এসব আসনেও বিএনপি কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। এর বাইরেও আরো কিছু আসন বিএনপি তাদের শরিক দলগুলোর জন্য ফাঁকা রেখেছে। বিএনপির নেতাদের প্রাথমিক যে হিসাব বা বিবেচনা, তাতে এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ছাড়া বাকি দল ও জোটগুলো থেকে ২০ থেকে ২৫টি আসনে মনোনয়ন পাওয়ার মতো প্রার্থী রয়েছেন।
গত সোমবার রাতে দলীয় প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পরই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে যাঁরা যুগপৎ আন্দোলন করেছেন, যেসব আসনে তাঁরা আগ্রহী, সেসব আসনে আমরা কোনো প্রার্থী দিইনি। আমরা আশা করছি, তাঁরা তাঁদের নাম ঘোষণা করবেন, তখন আমরা চূড়ান্ত করব।
বিএনপি গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩৭ আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। প্রার্থী তালিকার ৮৩ জন তরুণ প্রার্থী। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি ভবিষ্যৎ রাজনীতির চিন্তার চাপ দেখানোর চেষ্টা করছে। তবে দলের নেতারা বলছেন, তরুণ প্রার্থীদের বেশির ভাগকে প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে বিগত আন্দোলনে ভূমিকা দেখে। তবে প্রার্থী তালিকায় নতুনদের অনেকের পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমি রয়েছে—যেমন বাবা সংসদ সদস্য ছিলেন বা স্বামী জনপ্রতিনিধি ছিলেন। ২৩৭ জনের মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ১০ জন, সংখ্যালঘু প্রার্থী মাত্র ৪ জন; যা ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ দায়িত্বের দিক থেকে নগণ্য। এবারের প্রার্থী মনোনয়নে এটাকে দুর্বল দিক মনে করা হচ্ছে। বিক্ষোভের মুখে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে কামাল জামান মোল্লার মনোনয়ন স্থগিত করেছে বিএনপি। আগের দিন কামাল জামান মোল্লার নাম ঘোষণার পর সোমবার রাতেই এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী সাজ্জাদ হোসেন লাভলু সিদ্দিকীর অনুসারীরা ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম ও মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবীব উন-নবী খান সোহেল, সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা কামরুজ্জামান রতন মনোনয়ন পাননি।







