সংসদ অধিবেশনের প্রতি আগ্রহ কম তরুণ এমপিদের

রফিকুল ইসলাম সবুজ:

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে আগ্রহ কমেছে অপেক্ষাকৃত তরুণ এমপিদের। একাদশ জাতীয় সংসদে উপস্থিতি থেকে শুরু করে আইন প্রণয়নসহ সংসদ কার্যক্রমে সরকারি ও বিরোধীদলের প্রবীণ এমপিদের অংশগ্রহণ তরুণ এমপিদের তুলনায় বেশি বলে জানিয়েছেন সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টরা। গত তিন বছরে (সংসদের পঞ্চদশ অধিবেশন পর্যন্ত) ১৫৭ কার্যদিবসে এমপিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৪০ দিন উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসন-২৮-এর সৈয়দা রুবিনা আক্তার।

সবচেয়ে কম মাত্র ৫ দিন সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের একেএম সেলিম ওসমান। তবে সরাসরি নির্বাচিত ও সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে সন্তোষজনক। তাদের বেশিরভাগেরই সংসদে উপস্থিতি ৯৭ দিন থেকে ১৩৭ দিন পর্যন্ত।

সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিগত সংসদগুলোতে বিশেষ করে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদে অপেক্ষাকৃত তরুণ এমপিদের অধিবেশন কার্যক্রমের প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক বেশি ছিল। বর্তমান সংসদে প্রবীণ এমপিদের অধিবেশনে উপস্থিতির হার বয়সে তরুণ বা প্রথমবার এমপি হয়েছেন তাদের চেয়ে অনেক বেশি।

একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। তখন থেকে ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছরে সংসদের ১৫টি অধিবেশনে মোট বৈঠক হয়েছে ১৫৭ কার্যদিবস। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজশাহী-১ আসনের এমপি মো. ওমর ফারুক চৌধুরী ১৮ দিন, আওয়ামী লীগের তরুণ এমপিদের মধ্যে নড়াইল-২-এর মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ১৫৭ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র ১৯ দিন, যশোর-১ আসনের শেখ আফিল উদ্দিন ২৬ দিন, গাজীপুর-৪-এর সিমিন হোসেন রিমি ৩১ দিন, বাগেরহাট-২ আসনের শেখ তন্ময় ৩২ দিন, ঝিনাইদহ-২ আসনের তাহজীব আলম সিদ্দিকী ৩৫ দিন, নারায়ণগঞ্জ-৩-এর জাতীয় পার্টির লিয়াকত হোসেন খোকা ২২ দিন এবং মুন্সীগঞ্জ-১-এর বিকল্পধারার মাহী বি. চৌধুরী মাত্র ৩০ দিন সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।

অধিবেশনের উপস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রবীণ এমপিদের মধ্যে বেশিরভাগেরই সংসদে উপস্থিতি ৮০ থেকে ১১৫ কার্যদিবস পর্যন্ত। আর অপেক্ষাকৃত নতুন বা তরুণ এমপিদের বেশিরভাগের উপস্থিতি ৮০ দিনের কম। আওয়ামী লীগের গাজীপুর-২ আসনের এমপি, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল ৪৪ দিন, গাজীপুর-৩-এর ইকবাল হোসেন ৬৬ দিন, কিশোরগঞ্জ-৬-এর নাজমুল হাসান ৪০ দিন, নোয়াখালী-৪-এর একরামুল করিম চৌধুরী ৩৪ দিন, কিশোরগঞ্জ-৪-এর রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক ৬০ দিন, ময়মনসিংহ-১-এর জুয়েল আরেং ৬৬ দিন, সাতক্ষীরা-৪-এর জগলুল হায়দার ৫০ দিন, রাজশাহী-৬-এর মো. শাহরিয়ার আলম ৫৩ দিন, নওগাঁ-৫-এর নিজাম উদ্দিন জলিল জন ৫৮ দিন, শরীয়তপুর-৩-এর নাহিম রাজ্জাক ৬২ দিন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির মো. আমিনুল ইসলাম ৩৭ দিন ও ফরিদপুর-৪-এর স্বতন্ত্র এমপি মজিবুর রহমান চৌধুরী ৫১ দিন সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।

প্রবীণ এমপিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের শেরপুর-২-এর মতিয়া চৌধুরী ১৩৬ দিন, দিনাজপুর-৪-এর আবুল হাসান মাহমুদ আলী ১৩৬ দিন, পাবনা-১-এর শামসুল হক টুকু ১১০ দিন, পটুয়াখালী-২-এর আ স ম ফিরোজ ১২৫ দিন, ময়মনসিংহ-৯-এর আনোয়ারুল আবেদীন খান ১৩৮ দিন, কুমিল্লা-১১-এর মো. মুজিবুল হক ১১৩ দিন, মৌলভীবাজার-৪-এর মো. আব্দুস শহীদ ১০২ দিন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ১২০ দিন, ভোলা-১-এর তোফায়েল আহমেদ ৯১ দিন, বিরোধীদল জাতীয় পার্টির সুনামগঞ্জ-৪-এর পীর ফজলুর রহমান ১২৫ দিন, রংপুর-১-এর মশিউর রহমান রাঙ্গা ১২১ দিন, বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের ১১২ দিন, কিশোরগঞ্জ-৩-এর মো. মুজিবুল হক ১১০ দিন, বিএনপির চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩-এর মো. হারুনুর রশীদ ১১৭ দিন, বিকল্পধারার লক্ষ্মীপুর-৪-এর আবদুল মান্নান ১০০ দিন সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।

তবে ১৫৭ কার্যদিবসের মধ্যে চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী ১৫৫ দিন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৫০ দিন ও হুইপ শামসুল হক চৌধুরী ১৫০ দিন উপস্থিত ছিলেন।

সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান সংসদে নারী এমপিদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। আওয়ামী লীগের নোয়াখালী-৬-এর আয়েশা ফেরদাউস ১০৮ দিন, কক্সবাজার-৪-এর শাহীন আক্তার ১১০ দিন, কুমিল্লা-২ আসনের সেলিমা আহমেদ ১০৬ দিন, গাজীপুর-৫-এর মেহের আফরোজ ৯৭ দিন, সংরক্ষিত আসনের বেগম হোসনে আরা ও আদিবা আনজুম মিতা ১৩৭ দিন, নাহিদ ইজাহার খান ও নার্গিস রহমান ১২৮ দিন, মোছা. খালেদা খানম ১২১ দিন, গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার ১১৯ দিন, জাকিয়া তাবাসসুম ও খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন ১১৭ দিন, জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান ১০০ দিন, ওয়ার্কার্স পার্টির লুৎফুন নেসা খান ৮২ দিন ও বিএনপির রুমিন ফারহানা ৮৯ দিন সংসদ অধিবেশনে অংশ নেন। তবে বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে পারছেন না সংসদ উপনেতা ফরিদপুর-২-এর সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং বিরোধীদলীয় নেতা ময়মনসিংহ-৪-এর বেগম রওশন এরশাদ। তিন বছরে সাজেদা চৌধুরী ১৩ দিন এবং রওশন এরশাদ ৩৬ দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন।

সংসদে দলীয় এমপিদের উপস্থিতির বিষয়টি দেখভাল করেন হুইপরা। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, গত তিন বছরের মধ্যে প্রায় দুবছর করোনা মহামারিতে বিশেষ পরিস্থিতিতে সংসদ অধিবেশন পরিচালিত হয়েছে। করোনার কারণে আমরা চাইনি সবাই অধিবেশনে যোগদান করুক। তাই রোস্টার করে অধিবেশনের একেক দিন একেক গ্রুপকে সংসদে যোগদান করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ আলোচনার জন্য সিনিয়র এমপিদের এবং বিল সংক্রান্ত আলোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট এমপিদের অধিবেশনে আসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে হয়তো কোনো কোনো এমপি সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাই তরুণ এমপিদের সংসদ অধিবেশনের প্রতি আগ্রম কম এমনটি বলা যাবে না। তিনি বলেন, এখন করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সবাই সংসদ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন। সুত্র: দৈনিক সময়ের আলো

Print Friendly, PDF & Email