সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সরকারের স্থায়িত্ব ও উন্নয়ন দিয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আমেরিকা চাইলে যেকোন দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, আবার দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্তদের পক্ষ হয়েই তারা ওকালতি করে যাচ্ছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সরকারের স্থায়িত্ব ও উন্নয়ন এনে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইচ্ছামতো সরকার ভাঙ্গা-গড়া করতে পারছেন না বলেই অনেকেই ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের কথা বলছেন। এ সময় তিনি প্রথম আলোকে আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্র ও জনগণের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সোমবার জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ অধিবেশনের সমাপনী দিনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত না দেওয়াসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে এখানে এমন একটা সরকার আনতে চাচ্ছে, তার গণতান্ত্রিক কোন অস্তিত্ব থাকবে না। সেটা অগণতান্ত্রিক ধারা। আর সেই ক্ষেত্রে আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী, সামান্য কিছু পয়সার লোভে এদের তাবেদারি করে, পদলেহন করে।

যুক্তরাষ্ট্র সফরে একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আমেরিকায় যখন প্রথমবার যাই, সেখানকার আন্ডার সেক্রেটারির সঙ্গে আমার মিটিং হয়েছিল। বলেছিলাম, আমি একটি মনুমেন্ট দেখে এসেছি। সেখানে লেখা আছে, গবর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল। আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, সে দেশটি হচ্ছে, গবর্নমেন্ট অব দ্য আর্মি, বাই দ্য আর্মি, ফর দ্য জেনারেল। বলেছিলাম, আমেরিকা গণতন্ত্র চর্চা করে তাদের আটলান্টিকের পাড় পর্যন্ত। এটা যখন পার হয়ে যায়, তখন কি আপনাদের গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটা বদলে যায়? কেন আপনারা একটা মিলিটারি ডিকটেরকে সমর্থন দিচ্ছেন?
বিভিন্ন দেশের বিষয়ে মার্কিন অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে দেশটা কথায় কথায় গণতন্ত্রের ছবক দেয়। আমাদের বিরোধী দল থেকে শুরু করে কিছু কিছু লোক তাদের কথায় খুব নাচন-কোদন করছেন, উঠবস করছেন, উৎফুল্ল হচ্ছেন। হ্যাঁ, তারা (যুক্তরাষ্ট্র) যেকোন দেশের ক্ষমতা ওল্টাতে পারেন, পাল্টাতে পারেন। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো তো আরো বেশি কঠিন অবস্থার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। আরব স্প্রিং (আরব বসন্ত), ডেমোক্রেসির কথা বলে ঘটনা ঘটাতে ঘটাতে, এখন নিজেরা নিজেদের মধ্যে প্যাঁচে পড়ে গেছে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে সারাবিশ্বই অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, তারা গণতন্ত্রের জ্ঞান দিচ্ছে। কথায় কথায় ডেমোক্রেসি ও হিউম্যান রাইটসের কথা বলছে। তাদের দেশের অবস্থাটা কী? কয়েকদিন আগে আমেরিকার টেনেসিস রাজ্যে তিন জন কংগ্রেস ম্যান, এই তিন জনের অপরাধ হচ্ছে, তারা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য আবেদন করেছিল। তারা ডেমোনেস্ট্রেশন দিয়েছিলো, এভাবে যার তার হাতে অস্ত্র থাকা ও গুলি করে শিশুহত্যা বন্ধ করতে হবে। এটাই ছিল তাদের অপরাধ। আর এই অপরাধে দুই জনকে কংগ্রেস থেকে এক্সপেলড করা হয়। জাস্টিস জন ও জাস্টিস পিয়ারসন। একজন সাদা চামড়া ছিল বলে বেঁচে যান। তাদের অপরাধ হলো, তারা কালো চামড়া। সেই কারণে তাদের সিট আনসিট হয়ে যায়। সেখানে মানবাধিকার কোথায়? গণতন্ত্র কোথায়?

সংসদ নেতা বলেন, ১৫ আগস্টে যারা হত্যা করেছে, সেই খুনি রাশেদ (রাশেদ চৌধুরী) আমেরিকায় আশ্রয় নিয়ে আছে। সেখানে যতটা প্রেসিডেন্ট এসেছে, সবার কাছে আমি আবেদন করেছি। এই খুনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি, তাকে আপনারা আশ্রয় দেবেন না। সে শিশু হত্যাকারী, নারী হত্যাকারী, রাষ্ট্রপতির হত্যাকারী, মন্ত্রীর হত্যাকারী ও মানবতা লঙ্ঘনকারী। তাকে ফেরত দেন। কই তারা তো তাকে ফেরত দিচ্ছে না। খুনিদের লালন-পালন করেই রেখে দিচ্ছে তারা। তিনি আরো বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে তারা। এখন দেখা যায়, দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্তদের পক্ষ হয়েই তারা ওকালতি করে যাচ্ছে। আর গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে এমন একটা সরকার আনতে চাচ্ছে, যার গণতান্ত্রিক কোন অস্তিত্ব থাকবে না। সেই ক্ষেত্রে আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী সামান্য কিছু পয়সার লোভে তাবেদারি করে।

জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের সদস্যদের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনীর দাবি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে অনেকেরেই আপত্তি। যারা এই আপত্তির কথা তুলছেন, তাদের বোধহয় অভিজ্ঞতার অভাব আছে। এই ৭০ অনুচ্ছেদটা দেশে সরকারের একটা স্থায়ীত্ব এনে দিয়েছে। যার ফলে দেশটা উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ফ্লোর ক্রস করার কারণে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকার টিকতে পারেনি। এর আগে ১৯৪৬ সালেও ভারতবর্ষের নির্বাচনে একই খেলা হয়েছিল। যার কারণে আমাদের পূর্ব বাংলাটা যেভাবে গঠন হওয়ার কথা, সেভাবে হয়নি। এটা ১৯৫৬ সালের নির্বাচনেও হয়েছিল। পরে মার্শাল ল’ এসে ক্ষমতা দখল করে। কাজেই এই ৭০ অনুচ্ছেদটাই একটি সুরক্ষা দেয় গণতন্ত্রকে সুসমুন্নত করতে, সংহত করতে। আর এর সুফল জনগণ পেতে পারে। জানি না, কেন কিছু কিছু সদস্য এর ওপর এতো রাগ। কারণ হচ্ছে, সরকার ভাঙতে-গড়তে বা খেলাটা খেলতে তারা সক্ষম হচ্ছে না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।
স্বাধীনতা দিবসে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি খবরের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা ছোট্ট শিশুর হাতে ১০টা টাকা দিয়ে একটা মিথ্যা বলানো। শিশুর মুখ থেকে কিছু কথা বলানো। কী কথা! ভাত-মাছ-মাংসের স্বাধীনতা চাই। একটা সাত বছরের শিশু। তার হাতে ১০টা টাকা তুলে দেওয়া এবং তার কথা রেকর্ড করে সেটা প্রচার করে স্বনামধন্য এক পত্রিকা খুবই পপুলার, নাম তার প্রথম আলো। কিন্তু বাস করে অন্ধকারে। প্রথম আলো আওয়ামী লীগের শত্রু। প্রথম আলো গণতন্ত্রের শত্রু। প্রথম আলো দেশের মানুষের শত্রু (এ সময়ে সংসদে ‘সেম সেম’ শব্দ শোনা যায়)। এরা এই দেশ কখনোই স্থিতিশীল থাকতে দিতে চায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ওয়ান-ইলেভেনে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ভূমিকার সমালোচনার করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৭ সালে যখন ইমাজেন্সি হয়, তখন তারা উৎফুল্ল। দু’টি পত্রিকা আদাজল খেয়ে নেমে গেলো। বাহবা কুড়ালো। আর তার সঙ্গে আছে একজন সুদখোর (ড. ইউনুস), বড়ই প্রিয় আমেরিকার। আমেরিকা একবারও জিজ্ঞাস করে না, একটা ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, এটা তো একটা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। সরকারের বেতন তুলতো যে এমডি, সে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার কোথা থেকে পেলো? আমেরিকার মতো জায়গায় সামাজিক ব্যবসা করে। দেশে-বিদেশে বিনিয়োগ করে। এই অর্থ কোথা থেকে আসে? এদের কাছ থেকে দুর্নীতির কথা শুনতে হয়। এদের কাছ থেকে মানবাধিকারের কথা শুনতে হয়। যারা গরীবের রক্তচোষা টাকা পাচার করে বিদেশে বিনিয়োগ করে নিজেরা শতকোটি টাকা মালিক হয়, আবার আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়ে যায়। এ সব লোক এ দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।

বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে সংসদ নেতা বলেন, এখন নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা বলছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তো কোন প্রশ্ন ওঠেনি। যে বিরোধী দলকে বড় বিরোধী দল বলা হয়, তারা ২০০৮ সালে ২৯টি সিট পেয়েছিল। তারা যদি এত বড়ই বিরোধী দল হয়ে থাকে, তাহলে ২৯টি সিট পেলো কেন? সাজাপ্রাপ্ত আসামি হচ্ছে, সেই দলের চেয়ারপারসন। হত্যা-গুম-খুন-দুর্নীতি-জঙ্গিবাদ-সবকিছুতেই যারা পারদর্শী। তাদের জন্য দেশের মানুষ আতঙ্কে থাকতো। এখন তাদেরকে নিয়ে এত উৎফুল্লতা শুরু করছে, এটাই হচ্ছে দুর্ভাগ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, ১৪ বছর একটানা ক্ষমতায় আছি বলেই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছি। হ্যাঁ, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তারপরও আমাদের উৎপাদন বৃদ্ধি করে, দেশের মানুষেরর জন্য অতিরিক্ত দামে জিনিস কিনে এনে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা দিয়ে যচ্ছি। সবার দিকে আমাদের দৃষ্টি আছে। আমরা মানুষের ভাগ্য গড়তে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন গ্রাম আর শহরের পার্থক্য কমে গেছে। শহরের মাঝখানে আরেকটা শহর গড়ে উঠছে। প্রত্যেকটি গ্রামে আমরা নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *