ধানমন্ডি ‘৩২’

জেমী হাফিজ (বার্তা সম্পাদক, ডেইলী ইভিনিং নিউজ):

ধানমন্ডি ৩২ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাস ভবন, যা আজ বাঙ্গালির অন্যতম দর্শনীয় স্থান। বাড়িটির প্রতিটি জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু পুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামালসহ পরিবারের অন্যদের অনেক স্মৃতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বঙ্গবন্ধু যেখানে ছিলেন ১৪ বছর। ১৯৬১ সালের ১অক্টোবর থেকে যে বাড়িতে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন ঢাকার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের যে বাড়িটি থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

এই বাড়ি ছিল আন্দোলনের সকল পরিকল্পনা প্রণয়ন, দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মত বিনিময়, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনাসহ সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। এই বাড়িতে থেকেই ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বঙ্গবন্ধু উত্তোলন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বাড়ী থেকেই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বিভিন্ন জেলায় ওয়্যারলেস যোগে ট্রাঙ্ককলে স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তা পাঠিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবাইকে শামিল হওয়ার ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে দিয়েছিলেন। এই বাড়ি থেকে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করেছিল ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে।

১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডির এই ৩২ নং বাড়ীর পথে এসে সমবেত হয়েছিল অসংখ্য মিছিল। শেখ মুজিবুর রহমান এই বাড়িতে থেকেই প্রথমে বঙ্গবন্ধু এবং পরে বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন। ধানমণ্ডির এই বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড ও লাল সবুজের পতাকা এনে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রহর গুলো এই বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন। আজ সাক্ষী নানা চড়াই-উৎরাইয়ের।
ধানমন্ডির এই বাড়ির সিঁড়িতে যেখানে লেগে আছে বঙ্গবন্ধুর স্পর্শ। যেখানে পড়ে ছিল খুনী ঘাতকের বুলেটে বিদ্ধ বঙ্গবন্ধুর প্রাণহীন দেহ। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকেই নিষিদ্ধ করেছিলেন খুনীরা। আমাদের এই বাংলাদেশে ৭ মার্চের ভাষন বাজানো যেতো না। ভাষণ বাজালেই খুনীর দল মাইক কেড়ে নিতো। ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর সেই বাড়িটি ছিল দীর্ঘ কয়েক বছর তালাবদ্ধ। বাড়ির বাহির থেকে এখনো বিভিন্ন কৌতূহলী দৃষ্টিতে জনতা দেখে এবং কল্পনা করে ২৫ মার্চের রাত, সারা শহরে ছিল বুলেটের আওয়াজে আওয়াজে আতংকের। এ আওয়াজ আনন্দের ছিল না।

‘৩২ নম্বর’ নামে যে বাড়ির পরিচিত ছিল, বঙ্গবন্ধুর এই বাড়ির আসল নম্বর ১০, যে সড়কে বাড়িটি তার আগের নম্বর ছিল ৩২ নং, সড়কের নামেই এখন বাড়ির পরিচিতি। এখন সড়কের নতুন নম্বর ১১, তবে এই নম্বরটি বেশির ভাগ লোকই জানে না। সবাই জানে ‘৩২ নম্বর’।
এই বাড়িতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে কতিপয় বিশ্বাস ঘাতকের বুলেটের আঘাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে জীবন উৎসর্গ করেন। বাড়িটিতে মিশে আছে দেশের মানুষের অনেক আবেগ আর ভালোবাসা। এই বাড়িটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাড়িটি ১৯৮১ সালে সরকার শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন।

ধানমন্ডি ৩২ এর এই বাড়িটি সবাই যেন দেখতে পারে, সে জন্যই বঙ্গবন্ধুর বাড়িটিকে জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য “বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট” এর কাছে হস্তান্তর করেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’ নাম দিয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’। এই বাড়িতেই স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ১৯৭৫-সালে ১৫ই অগাস্টের রাতে সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন।

 

Print Friendly, PDF & Email