বাগেরহাটে দুটি আসনে এমএএইচ সেলিমের জয়ের সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাগেরহাটের নির্বাচনী মাঠ বর্তমানে বেশ উত্তপ্ত। বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট শিল্পপতি এম.এ.এইচ. সেলিম ঘোড়া প্রতীক নিয়ে তার নির্বাচনী প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব সৃষ্টি করেছেন। তার সমর্থনে প্রতিদিনই বিভিন্ন উপজেলায় কর্মীসভা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাগেরহাটের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন তিনটি আসনে ভোটে লড়লেও বাগেরহাট-১ ও ২ এই দুটি আসনে এমএএইচ সেলিম এর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ তিনি সদর আসনে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীনকে পরাজিত করে সারা দেশে আলোচনায় এসেছিলেন। ঐসময়ে তিনি মুনিগঞ্জ সেতু ও শহর রক্ষা বাঁধসহ নির্বাচনী এলাকায় সড়কের ব্যাপক উন্নয়ন এবং প্রচুর সংখ্যাক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসিজদ, মন্দিরসহ ধর্মিয় প্রতিষ্ঠান নির্মান করার কারণে স্থানীয়দের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।

একাধিক ভোটার জানান, ২০০১ সালে এমএএইচ সেলিম বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ব্রিজ-কালভার্ট, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-মন্দিরের ব্যাপক উন্নয়ন করেন। অনেকে তাকে ‘বাগেরহাটের উন্নয়নের রূপকার’ বলে অভিহিত করেন। তবে ওয়ান ইলেভেনের সরকার আসার পর অন্যান্য অনেক নেতার মতো তাকেও রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়। তবে দীর্ঘ বিরতির পর রাজনীতিতে তার ফিরে আসা এবং স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মাঝে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই বলছেন এমএএইচ সেলিম বীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অধিকাংশ ভোটই তিনি পাবেন। এছাড়া সংখ্যালঘু ভোটও তার পক্ষে থাকবে।

সেলিম নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বাগেরহাটের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় একাধিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। সংসদ সদস্য থাকাকালে শহররক্ষা বাঁধ, মুনিগঞ্জ সেতু, মাজেদা বেগম কৃষি প্রযুক্তি কলেজ, বেলায়েত হোসেন ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই সময় বাগেরহাটে যে উন্নয়নের ধারা শুরু হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা থমকে যায়। বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি জেলা বিএনপির সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও ক্ষমতাসীন দলের রোষানলের কারণেই তিনি প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন।

বাগেরহাটে বিএনপি থেকে মনোনীত চার প্রার্থীই নতুন মুখ। জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনীত চারজনের মধ্যে দুজন নতুন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, মুসলিম লীগসহ মোট ২৩ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বাগেরহাট-১ : চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটিকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে সবসময় আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে এসেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ না থাকায় এবার ভিন্ন চিত্র। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি থেকে মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, জামায়াতের মশিউর রহমান খান, সাবেক বিএনপি নেতা এম এ এইচ সেলিমসহ মোট সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি প্রথমবারের মতো সনাতন ধর্মাবলম্বী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে মনোনয়ন দিলেও তার প্রতি বিএনপির নেতা কর্মিদের যেমন সমর্থন কম তেমনি সংখ্যালঘুদেরও একটা বড় অংশ তাকে ভোট দেবেন না বলে জানা গেছে। সংস্লিষ্টরা জানান, এক্ষেত্রে বিএনপি ও সংখ্যালঘুদের একটি বড় অংশের ভোট পাবেন মুক্তিযোদ্ধা এমএএইচ সেলিম। কারণ এলাকার লোকজন এমপি হিসেবে সেলিমের উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড সম্পর্কে ভাল ভাঊেন জানেন। তিনি এমপি হলে বাগেরহাটের উন্নয়ন হবে এমন বিশ্বাস ভোটারদের মধ্যে রয়েছে।

একই ভাবে বাগেরহাট-২ আসনেও (বাগেরহাট সদর ও কচুয়া) ভাল অবস্থানে সেলিম। এ আসনে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এ আসনে বিএনপি থেকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, জামায়াতের শেখ মনজুরুল হক রাহাদ এবং স্বতন্ত্র এম এ এইচ সেলিম লড়ছেন। ২০০১ সালে জয়ী হয়ে ব্রিজ-কালভার্ট, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-মন্দিরের ব্যাপক উন্নয়ন করেন। অনেকে তাকে ‘উন্নয়নের রূপকার’ বলে অভিহিত করেন। বিএনপি প্রার্থী দলীয় সমর্থন নিয়ে লড়ছেন, সেলিম রড়ছেন উন্নয়নের জয়রথ নিয়ে।

বাগেরহাট-৩ : মোংলা ও রামপাল উপজেলা নিয়ে গঠিত। আসনটিতে বিএনপির শেখ ফরিদুল ইসলাম, স্বতন্ত্র এম এ এইচ সেলিম এবং জামায়াতের মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ শেখ প্রার্থী হয়েছে। জামায়াত-বিএনপির লড়াইয়ের মধ্যে সেলিম বিএনপিকে বিপদে ফেলতে পারেন।

বাগেরহাট-৪ : মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা নিয়ে গঠিত। বিগত দিনে আওয়ামী লীগ-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি (মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতি সোমনাথ দে) ও জামায়াত (মো. আব্দুল আলীম) মধ্যে লড়াই হবে বলে ধারণা।

এম এ এইচ সেলিম বলেন, বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা জিততে পারবেন না। দলকে পরীক্ষা করার জন্য স্বতন্ত্র হয়েছি। আমি না লড়লে অন্য দল জিতে যেত। সাধারণ মানুষ আমাকে চায়, দোয়া করে। ব্যবসা ফেলে রেখে নির্বাচনে সময় দিচ্ছি, ক্ষতি হলেও মানুষের ভালোবাসা উপেক্ষা করতে চাই না। তিনি দলমত নির্বিশেষে বাগেরহাটের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ করছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি দলের সঙ্গে থাকবেন এবং এলাকার উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমনকে গুরুত্ব দেবেন। ভোটারদের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, বিবেচনার মাধ্যমে সঠিক প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাগেরহাটের উন্নয়নে সহায়তা করুন।