ভূমিধ্বস বিজয়ে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে বিএনপি। দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি। এর মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল ও জোটের সরকার গঠন নিশ্চিত হলো। সেইসাথে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। যিদি দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। আওয়ামী লীগহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে দলটি।

সর্বশেষ প্রাপ্ত বেসরকারি ফলাফলে ২৯৭ আসনের মধ্যে ২১২টিতে বিএনপি জোট, ৭৬টিতে জামায়াত জোট ও স্বতন্ত্রসহ অন্যান্য প্রার্থীরা ৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন। এছাড়া দুটি আসনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে যেদুটি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। এ নিয়ে বিএনপি একক ভাবে ২১১ আসনে জয় পেয়েছে। আর জোটের শরিক তিনটি দল একটি করে আসনে জয়ী হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৯৯ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১৪টি আসন। এছাড়া ৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন যাদের প্রায় সবাই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ৭৭ আসনের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি এবং এনসিপি ৬টি আসন পেয়েছে।

ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকা-১৫ আসনে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জিতেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে দলটি। এবারের নির্বাচনে গণভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার ২৯৭ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই দুটি আসনের ফলাফল পরে ঘোষণা করা হবে। একটি আসনের ফলাফল আগেই স্থগিত করা হয়। শুক্রবার আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ফলাফল ঘোষণার সমাপনী বক্তব্যে ইসি সচিব আখতার আহমেদ এসব তথ্য জানান। বিএনপি একক দল হিসেবে পেয়েছে ২০৯টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন, জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি- বিজেপি একটি, গণসংহতি আন্দোলন একটি, গণঅধিকার পরিষদ একটি আসন পেয়েছে।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ২৯৯টি আসনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুক্রবার দুপুরে ইসির জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সারাদেশের কেন্দ্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এখনো কিছু বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রের চূড়ান্ত হিসাব আসা বাকি। তবে সামগ্রিক ভোটের হার ৫৯.৪৪ শতাংশেই স্থিতিশীল রয়েছে।
তারেকের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন :

১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনবার সরকারগঠন করেছিল তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আর এবার তাদেরই সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি চতুর্থবারের মত দেশ শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একানব্বইয়ের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল বিএনপি। তার পরের তিন নির্বাচনে দুই বার সরকার গঠন করলেও মেয়াদ শেষ করতে পেরেছিল একবার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে দলটি চলে গিয়েছিল শাসন ক্ষমতার বাইরে।

আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি নির্বাচনের দুটি বর্জন করেছিল বিএনপি, একটিতে হয়েছিল ভরাডুবি। এরপর চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর নতুন বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সরকারে ফেরার পথ তৈরি হয়। ১৯ বছর পর বিএনপি যখন সরকারে ফিরছে, তখন নতুন মেরুকরণে বিরোধীর আসনে নেই তাদের ৩৫ বছরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞা আর নিবন্ধন স্থগিত থাকায় সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশ শাসন করা আওয়ামী লীগের এবার ভোট করার সুযোগ ছিল না।

বাংলাদেশের যে কোনো নির্বাচন সর্বোচ্চ ১৮ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী সেই সুযোগে এবার বিএনপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েছে বেশ। মায়ের ব্যাটন হাতে তুলে নেওয়ার ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে বাংলাদেশের ক্ষমতা কেন্দ্রে প্রায় তিন যুগের চেনা চেহারা বদলে যাবে। এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে তার মা, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে। প্রায় দেড় দশক টানা দেশ শাসন করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এখন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আর আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিয়েছেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুজনে একটা সময়ে পর্যায়ক্রমে সরকার প্রধান হয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একজন যখন সরকার প্রধান হয়েছেন, অন্যজন তখন থেকেছেন বিরোধী দলীয় নেতার ভূমিকায় রাজপথে। এক সময় তাদের বৈরি সম্পর্ককে বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো ‘দুই বেগমের যুদ্ধ’ হিসেবেও চিত্রিত করেছে।

২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার জন্য তখনকার বিএনপি সরকারকে দায়ী করে আওয়ামী লীগ। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলার সাজা নিয়ে কারাগাযে যেতে হয়েছিল। পরে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও অসুস্থতার কারণে তাকে একপ্রকার ঘরবন্দি জীবন কাটাতে হয়। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর খালেদা জিয়া পুরোপুরি মুক্ত হন, আদালতের রায়ে মুক্তি পান সাজা থেকেও। গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া যখন চিরবিদায় নেন, তার কয়েক সপ্তাহ আগে ঘোষিত হয়েছিল ত্রয়োদশ নির্বাচনের তফসিল। তার মৃত্যুর পর বিএনপির এক শোকাহত কর্মী আক্ষেপ করেছিলেন, “ও আল্লাহ, আর কয়টা দিন বাঁচায় রাখতা, আমার ম্যডাম যাতে নির্বাচনটা দেইখা মৃত্যুবরণ করত।”

আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে এই নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি ছোটবড় দল। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোটের মাঠে প্রার্থী ছিলেন ২০২৮ জন। ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৩ জন।