বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পাওয়ায় গণভোটের রায় এখন অপ্রাসঙ্গিক
রফিকুল ইসলাম সবুজ:
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় পাওয়ার পর এখন আলোচনায় জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া। ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষের প্রস্তাবসহ জাতীয় সনদের অনেকগুলো বিষয়ে ভিন্নমত ছিল বিএনপির। দলটির নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে। এমন বাস্তবতায় সনদের কতটুকু বাস্তবায়ন হবে এবং উচ্চকক্ষ গঠিত হলে তা ভোটের আনুপাতিক হারে না কি বিএনপির দেওয়া মতামত অনুযায়ী আসনের সংখ্যানুপাতিক হারে হবে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
আইনবিদরা বলছেন সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার কেবল সংসদের। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পাওয়ায় গণভোটের রায় এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। তা ছাড়া গণভোটের আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে জুলাই সনদ কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নির্ভর করছে সংসদ সদস্যদের ওপর, যাদের দুই- তৃতীয়াংশের বেশি বিএনপি জোটের। বিশ্লেষকদের অপর অংশ অবশ্য বলছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংসদের ওপর একটা নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে বলেই জুলাই সনদের বর্ণিত প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে বা নির্বাচিত সরকার সব প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য থাকবে বিষয়টা এমন নয়। কারণ কোনো সরকার বা কোনো সংসদ পরবর্তী সংসদ কী করবে বা করতে পারবে না, সেটি ঠিক করে দিতেপারে না। সংসদ চাইলে পূর্ববর্তী সংসদে গৃহীত যেকোনো আইন বাতিল করে দিতে পারে। সেই হিসেবে সংসদ চাইলে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বাতিল করেও দিতে পারবে। সেই এখতিয়ার সংসদের আছে। যদিও সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি অনীহা দেখালে রাজনৈতিক বিবেচনায় তা নেতিবাচক হতে পারে।
জুলাই সনদ নিয়ে দুই কক্ষের সংসদ এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু করার বিষয়ে সার্বিক ঐকমত্য ছিল না। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আগে উচ্চকক্ষের ১০০ আসনে পিআর পদ্ধতির প্রস্তাব করলেও, বিএনপি এতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে তারা সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষের প্রস্তাব দিয়েছিল। গণভোটের রায় অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু সরকার গঠন করতে যাওয়া দল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ ছিল সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে গঠিত হবে উচ্চকক্ষ। ফলে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় উচ্চকক্ষে পিআর মানবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় এলেও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়গুলো কতটা বাস্তবায়ন হবে তা নির্ভর করছে সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর। নির্বাচনে দুই- তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপি আগে থেকেই বলে আসছে কোনো আদেশের মাধ্যমে নয়, একমাত্র সংসদের সিদ্ধান্তই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি দিতে পারে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, গণভোটের রায় এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে। তারা আগেই ঘোষণা দিয়েছে যে সংবিধান সংশোধনের একমাত্র এখতিয়ার সংসদের। তা ছাড়া নির্বাচনের পরও দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা তাদের ৩১ দফার আলোকে এবং জুলাই সনদে তারা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে। তারা সংসদের মাধ্যমে এটা বাস্তবায়ন করবে। বিএনপির এই বক্তব্যে আইনি জটিলতা নেই। সুতরাং জনগণ যাদেরকে দুই-তৃতীয়াংশ আসন দিয়ে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে তারা তো সেই ভাবেই সংবিধান সংশোধন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলো, কি না হলো এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই বলে তিনি মনে করেন।
মনজিল মোরসেদ জানান, সব দল আলোচনা করে একমত হলেও সংসদের উচ্চকক্ষের কোনো প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না। তার মতে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে এটি করা হলে তা হবে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় খরচ। এটা করা হচ্ছে শুধু রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রোভাইড করার জন্য। বিশেষ করে যারা নির্বাচন করতে পারবে না বা নির্বাচন করলে জয়ী হতে পারবে না এমন লোকজনকে দলগুলো উচ্চকক্ষে বসাতে চায়। আমাদের মতো ছোট দেশে উচ্চকক্ষ করা বাড়তি খরচ। সংবিধানে আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি ভালোভাবেই দেওয়া আছে। কেউ যদি সংবিধান সংশোধন আরও কঠিন করতে চায় তা হলে সংবিধান সংশোধন করে সেখানে বলতে পারে যে মৌলিক কিছু কিছু বিষয় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হলেও আবার জনগণের মতামত নিতে পারে গণভোটের মাধ্যমে। এটা না করে উচ্চকক্ষ বানিয়ে খরচ বাড়ানো হলেও সেটা তো জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে না। কারণ তারা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, গণভোট কোনো আইনসিদ্ধ ব্যাপার ছিল না। তাই গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতেই হবে, এমন আইনি বাধ্যবাধকতা আছে বলে তিনি মনে করেন না। তার দাবি, জাতীয় সনদে সংবিধান পরিপন্থী কিছু বিষয় রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি বর্তমান জাতীয় সংসদই ঠিক করবে। সনদে বর্ণিত বিষয়গুলোর কোনটি সঠিক এবং বাস্তবায়ন উপযোগী তা সংসদে আলোচনা করেই ঠিক করতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপি এখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল। বেআইনি বিষয়গুলো চাইলেই কেউ পাস করতে পারে না। কারণ দেশে এখনও আইন-আদালত রয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক ভিন্নমত দিয়েছেন। তিনি মনে করেন ‘জুলাই সনদের’ ওপর আয়োজিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সনদ বাস্তবায়নে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। ফলে সংসদ সদস্যদের জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না করার আইনি এখতিয়ার থাকলেও, তা করার কোনো নৈতিক বৈধতা তাদের নেই। তিনি বলেন, বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে যদি জুলাই সনদকে দুর্বল করা, বিলম্বিত করা কিংবা মৌলিকভাবে পরিবর্তনের ম্যান্ডেট হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তা হবে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে দেওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি অবজ্ঞা। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট গণভোটের পর, সে দেশের সংসদ জনগণের রায়ের ওপর নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দেয়নি। বরং গণভোটের ফলকে কার্যকর করতে আইন প্রণয়ন করেছিল, কারণ তারা স্বীকার করেছিল যে, জনমতই চূড়ান্ত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বহন করে।
এ ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। বিএনপি সবসময় জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তাই আশা করা যায়, দেশ পরিচালনা ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে দলটি জনগণের এই প্রত্যাশা বিবেচনায় নেবে।
প্রসঙ্গত, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর গেজেটে বলা হয়েছে, গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট (‘হ্যাঁ’) সূচক হলে (ক) জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যারা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং সেটি সম্পন্ন হওয়ার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। অর্থাৎ যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, তারা প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন এবং এই সময়ের মধ্যে জুলাই সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন যে, সনদের কোন কোন বিধানের কতটুকু তারা রাখবেন বা রাখবেন না। পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা পুরো জুলাই সনদ অনুমোদনের পক্ষে ভোট দিতে পারেন। আবার প্রতিটি প্রস্তাব নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ও বিতর্ক হতে পারে। সেই বিতর্কের মধ্য দিয়েই ঠিক হতে পারে যে, পরিষদ কোন কোন প্রস্তাব অনুমোদন করবে বা করবে না। কোনো কোনো প্রস্তাব সংশোধিত আকারেও পাস হতে পারে।





