কার্যকর সংসদ ও সুশাসন
মো. সফিউল আলম :
সংসদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন করা হলেও সুশাসন নিশ্চিত করতেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংসদ বিভিন্ন উপায়ে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের তিনটি প্রধান দায়িত্ব রয়েছে। আইন প্রণয়ন, নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ। কার্যকর সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা দেশের শাসনব্যবস্থার উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সংসদকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে একটি সংগঠিত ও শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ট্রেজারি বেঞ্চ, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলকেও আন্তরিকভাবে সংসদকে গণতান্ত্রিক চর্চা, বিতর্ক ও সংলাপের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
গত প্রায় ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশে সংসদ কার্যত অকার্যকর ছিল এবং জনগণের অর্থ ব্যয় হলেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ছিল কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এবং ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যার ফলে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে খুব কম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফলে শাসনব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংসদে গণতান্ত্রিক চর্চা প্রায় অনুপস্থিত ছিল এবং সংসদ খুব কম ক্ষেত্রেই বিতর্ক ও সংলাপের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।
যদি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মিত উপস্থিত থেকে কার্যপ্রনালীবিধি (Rules of Procedure—RoP) অনুযায়ী আন্তরিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় সংসদের ভূমিকা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি রয়েছে, যেগুলোর দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তসমূহ পর্যালোচনা করা। এসব কমিটির নিয়মিত বৈঠক করার বিধান রয়েছে এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকেন। কমিটিগুলো প্রয়োজন হলে কর্মকর্তাদের তলব করে তাদের সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে।
কোনো মন্ত্রণালয় যদি কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে, তবে বিষয়টি পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (PAC)-এর কাছে পাঠানো যেতে পারে। সর্বোচ্চ সংসদীয় তদারকি সংস্থা হিসেবে PAC সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হিসাব পরীক্ষা করতে পারে, আর্থিক অনিয়ম তদন্ত করতে পারে, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে এবং সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে পারে।
এছাড়া সংসদে একটি অ্যাস্যুরেন্স কমিটি রয়েছে, যা সংসদের অধিবেশনে মন্ত্রীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন তদারকি করে। কমিটিগুলো প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোতে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে পারে। সংবিধান ও কার্যপ্রনালীবিধিতে যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে, তা সুশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট।
সম্প্রতি, ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য দলীয় কার্যালয়ে দুই দিনব্যাপী একটি ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি আয়োজন করেছে। সংসদীয় চর্চা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এটি যথেষ্ট নয়। কারণ, দলের অনেক সংসদ সদস্যই প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন এবং এই ওরিয়েন্টেশনে সংসদ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বা রিসোর্স পারসনদের তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না। তবুও এটি একটি ভালো সূচনা হিসেবে প্রশংসার দাবি রাখে।
সংসদ সচিবালয় পর্যায়ক্রমে পর্যাপ্ত সময় ও সম্পদ বরাদ্দ করে সব সংসদ সদস্যের জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশন আয়োজন করতে পারে। নবম সংসদের সময় ২০১২ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) সংসদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর উন্নয়ন সহযোগীরা সেই প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। তবে সে সময় বেশ কিছু জ্ঞানভিত্তিক উপকরণ সংসদ সচিবালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, যা বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদে কাজে লাগানো যেতে পারে।
এবার আশা করা যায় যে বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা আরও সক্রিয় হবে। কারণ প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামির সরকারে কোনো অংশীদারিত্ব নেই—যেমনটি অতীতে জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল, যারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তথাকথিত ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচিত ছিল। দ্বৈত ভূমিকার অভিযোগে সমালোচিত জাতীয় পার্টি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি আসনও না পেয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
এবার সংসদে আরও কয়েকটি ছোট দল রয়েছে। তাদের সংসদে কিছু আসন রয়েছে এবং দেশের রাজনীতিতেও তাদের প্রভাব আছে। জনগণের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে তারা সোচ্চার ভূমিকা রাখবে-এমন প্রত্যাশা করা অমূলক নয়। তবে সংসদের অনেক সদস্যই নতুন হওয়ায় তাদের দক্ষতা বাড়াতে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও জ্ঞানচর্চা প্রয়োজন।
একটি প্রাণবন্ত সংসদে সব ধরনের জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয় এবং সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডই প্রশ্নাতীত থাকে না। এ ধরনের সংসদীয় প্রাণচাঞ্চল্য জনগণের মনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়েও সংসদে আলোচনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের জন্য আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সমস্যার বিষয়েও সংসদে গঠনমূলক আলোচনা হতে পারে।
যদি সংসদে মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী কথিত ‘সিন্ডিকেট’ সম্পর্কে ঐকমত্য গড়ে ওঠে, তাহলে বাজার কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একইভাবে সংসদে গৃহীত সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটতে পারে। সংক্ষেপে বলা যায়, দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংসদকে কেন্দ্র করেই আলোচিত হতে পারে এবং সমগ্র জাতি সংসদের বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দিকনির্দেশনা পেতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর তথ্য অনুযায়ী, সংসদের অধিবেশন পরিচালনায় প্রতি মিনিটে প্রায় ২.৭২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু কোরামের অভাবের কারণে প্রতিদিন গড়ে ১৪ মিনিটের বেশি সময় অপচয় হয়। একাদশ সংসদে কোরাম সংকটের কারণে অপচয় হওয়া সময়ের আর্থিক মূল্য প্রায় ৮৯.২৮ কোটি টাকা বলে TIB-এর “Parliament Watch” প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদের কার্যক্রমের মোট সময়ের মাত্র ১৬.৭ শতাংশ আইন প্রণয়নে ব্যয় হয়েছে।
বাজেট অধিবেশন ও অপ্রয়োজনীয় প্রশংসা
সংসদে বাজেট বক্তৃতার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রশংসা ও স্মরণে অনেক সময় ব্যয় করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের হতাশার কারণ হয়েছে এবং জনসাধারণের অর্থের অপচয় ঘটিয়েছে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোর সময়েও এই ধারা অব্যাহত ছিল।
গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে গেছে এবং চলতি অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদে এ ধরনের অপচয় দেশের পক্ষে কতটা গ্রহণযোগ্য-সেটি ভাবার সময় এসেছে।
সংসদ তার নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করুক, জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করুক এবং জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের যথার্থ প্রতিফলন ঘটাক-এটাই প্রত্যাশা।
(লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক। দ্য ফাইন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য নিউজ টুডে, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট এবং দ্য ডেইলি অবজারভার পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন)।
ইমেইল: shafiul.alam.sac@gmail.com





