নতুন বয়ান কতটা টেকসই, কতটা বাস্তবসম্মত
মো. সফিউল আলম :
বাংলাদেশের রাজনীতি একটি পুনর্গঠনের পর্ব অতিক্রম করছে। দীর্ঘ একক শাসনের অবসান, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাস দেশের রাজনৈতিক বয়ানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-এই নতুন বয়ান কতটা টেকসই, কতটা জনসমর্থননির্ভর এবং কতটা বাস্তবসম্মত?
জুলাই ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড় সৃষ্টি করেছে। তবে ভবিষ্যতে এই অভ্যুত্থান কতটা জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামি এবং এনসিপির মতো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কাছে এই অভ্যুত্থান একটি কৌশলগত রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
এই দুটি দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তাদের রাজনৈতিক আদর্শের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেনি। ফলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নির্ধারক ও বৈধতার প্রধান উৎস— তাদের কাছে কার্যত বিকল্পহীন রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে জুলাই ২০২৪ অভ্যুত্থানের বয়ান ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতিতে ফিরে এসে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে। তবে শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট হবে না। বাস্তব রাজনীতিতে জনগণের প্রধান উদ্বেগ হলো— দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সুশাসনের অভাব।
বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল অতীতের ইতিহাস নয়, বরং বর্তমানের শাসন সংকট মোকাবিলায় সক্ষম। দুর্নীতি দমন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয় হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের ভোটাররা ঐতিহাসিকভাবে আদর্শ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে ভোট প্রদান করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক হলেও দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক চাপ অনেক ক্ষেত্রে আদর্শিক রাজনীতিকে ছাপিয়ে যায়।
যদি বিএনপি সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের একটি অংশ আদর্শগত দ্বিধা সত্ত্বেও জামাত বা এনসিপির মতো দলগুলোর প্রতি ঝুঁকতে পারে। বাস্তব রাজনীতিতে জনগণের ভোট অনেক সময় আদর্শের চেয়ে জীবনমানের বাস্তবতায় নির্ধারিত হয়— এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নির্মম কিন্তু বাস্তব সত্য।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও ক্ষমতাচ্যুতির পর জনরাজনীতি থেকে আপাতত দূরে অবস্থান করছে। দলটির রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও জনসমর্থন পুনরুদ্ধার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হবে। ফলে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ মূলত বিএনপি, জামাত, এনসিপি ও অন্যান্য নতুন শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবর্তিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে আদর্শিকভাবে দ্ব্যর্থপূর্ণ শক্তিগুলো জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করবে, যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বয়ান সম্ভবত দুটি স্তরে গড়ে উঠবে—একদিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক বৈধতা, অন্যদিকে কার্যকর শাসন ও অর্থনৈতিক দক্ষতার বাস্তব ফলাফল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভবিষ্যতেও রাজনৈতিক বৈধতার মূল ভিত্তি থাকবে, কিন্তু জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ক্রমেই নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলের কর্মদক্ষতা, নীতি বাস্তবায়ন ও শাসন সক্ষমতার ওপর।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াত একটি স্পষ্ট ধাক্কা খেয়েছে—এর অন্যতম কারণ ছিল তাদের প্রকাশ্য নারীবিরোধী অবস্থান। দলটি কোনো আসনেই একজন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি; উপরন্তু দলীয় নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে নারীর স্থান নেই—এমন বার্তাও তারা সুস্পষ্টভাবে দিয়েছে। এ অবস্থান শিক্ষিত, কর্মজীবী ও মধ্যবিত্ত নারীসমাজের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনীতিতে যে অগ্রগতি অর্জন করেছেন, তা রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই বহু নারী ভোটার জামায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
সমাজে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে—জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীর জনপরিসরে অংশগ্রহণ সংকুচিত হতে পারে, তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব হতে পারে, এমনকি কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র অবস্থানও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের প্রশ্নে খুব বেশি ভিন্ন নয় বলে জনমনে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে নারীর ভোটব্যাংক—যা এখন নির্বাচনী সমীকরণে একটি নির্ধারক শক্তি—এই দুই দলের প্রতি আস্থাশীল হতে পারেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে তাদের বিতর্কিত অবস্থান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বর্ণনা ও মূল্যবোধ এখনও এক গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। জামায়াতের অতীত ভূমিকা এবং এনসিপির অবস্থান নিয়ে সংশয় তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার পথে একটি দীর্ঘস্থায়ী বাধা হয়ে আছে। ফলে নারীবিষয়ক অবস্থান ও মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত প্রশ্ন—এই দুই ইস্যু মিলেই জামায়াত-এনসিপি জোটকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিকূলতার মুখে ফেলছে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা একরৈখিক নয়। যদি জনপ্রিয় বিএনপি সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি দমন, এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ন্যূনতম সাফল্যও দেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে ভোটারদের একাংশ বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হবে। ইতিহাস বলে, জনঅসন্তোষ যখন চূড়ায় ওঠে, তখন আদর্শগত আপত্তি সাময়িকভাবে পেছনে পড়ে যায়। সে প্রেক্ষাপটে জামায়াত ও এনসিপি নিজেদের পুনর্গঠিত ও পুনর্বিন্যস্ত করে আবারও রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অতএব, নারীর অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সুশাসন—এই তিনটি ইস্যুই আগামী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। যে দল এই ত্রিভুজের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে, জনগণের আস্থা শেষ পর্যন্ত তার দিকেই ঝুঁকবে।
জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও এটি এককভাবে ভবিষ্যৎ রাজনীতির ভিত্তি হয়ে উঠবে-এমন নিশ্চয়তা নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক নিয়ামক, কিন্তু সেই চেতনাকে কার্যকর শাসন ও জনকল্যাণে রূপ দিতে না পারলে জনগণ বিকল্প খুঁজবে। বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ তাই নির্ধারিত হবে একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে-কে শুধু ইতিহাসের কথা বলবে, আর কে ইতিহাসের দায় নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে পারবে।
লেখক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
shafiul.alam.sac@gmail.com






