গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে

সংসদ প্রতিবেদক:
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে রিট হলে গত ৩ মার্চ হাইকোর্ট এবিষয়ে রুল জারি করেছে। এই রিটের পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনার মধ্যেই বুধবার গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের জন্য সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে সংসদের বিশেষ কমিটিতে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। বিএনপির আপত্তির কারণে বিশেষ কমিটির বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। উচ্চ আদালতে রিট এবং সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে সরকারি দলের আপত্তির কারনে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, গণভোটে হ্যা জয়ী হলেও রায় বাস্তবায়ন আদৌ হবে কি না তা নির্ভর করছে উচ্চ আদালত ও সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ অধিবেশন ডাকার সময় ছিল ৩০ দিন। নির্বাচনী ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর গত ১৫ মার্চ সেই সময় শেষ হয়ে গেলেও রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেননি। এমনকি এই পরিষদের জন্য বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি জোটের এমপিরা শপথ নিলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারদলীয় এমপিরা সেই শপথও নেননি। এর মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশ কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের একটি অংশ। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হলেও জাতীয় সংসদ ইচ্ছা করলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে পারে বলে মনে করেন তারা। তাদের মতে, সংবিধান সংস্কার হওয়া উচিত সাংবিধানিক নিয়মেই। বাংলাদেশের সংবিধান কীভাবে পরিবর্তন হবে তা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে। তাই জাতীয় সংসদেই সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী বা সংস্কার আনা সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ না হলেও সংস্কারের পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। সংস্কার সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই সম্ভব। কারণ কেউই অস্বীকার করছে না যে, সংস্কারের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে সংসদে আলাপ আলোচনা করে সংস্কারের প্রস্তাব পাশের পর আবার গণভোট) দিতে পারে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে আদেশ জারি করা হয়েছে, সেই আদেশেরই কোনো আইনি ভিত্তি নেই। কারণ রাষ্ট্রপতির এ ধরনের আদেশ জারি করার কোনো ক্ষমতাই নেই। ইতোমধ্যেই আদেশটি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে এবং আদালত রুল জারি করেছেন। তিনি বলেন, অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তাই বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে সেটি আইনত ও সাংবিধানিকভাবে যথাযথ। তবে বিএনপির যেহেতু এই সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন রয়েছে, তারা ইচ্ছা করলে রাজনৈতিক ঐক্যমতের বিষয়গুলোকে সংসদের মাধ্যমে সংশোধন করে সংবিধানে আনতে পারে। তিনি জুলাই সনদে যেসব বিষয় এসেছে; যেমন ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ সংসদের মাধ্যমে সংবিধানে আনা সম্ভব। সংসদ ইচ্ছা করলে মৌলিক কিছু বিষয় ভবিষ্যতে পরিবর্তনের জন্য গণভোটের বিধান সংবিধানে যুক্ত করতে পারে। তবে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী এসব পরিবর্তনে গণভোটের প্রয়োজন পড়বে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোটের বিষয়ে এখন যে বিতর্ক হচ্ছে, তার সমাধান সংবিধানে নেই। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের ভিত্তিতে নয়, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এসেছে। সরকার যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে এবং গণভোটে মানুষ যে রায় দিয়েছে, সেখানেই এর সমাধান আছে। তিনি বলেন, ‘আইন অঙ্গনে একটা ডকট্রিন আছে, কল “ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন”। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিষয়। কতগুলো রাজনৈতিক বিষয় আছে, রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয় আছে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিষয় আছে, সেগুলো আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত হওয়া উচিত। রাজনীতিবিদেরা বহু সময় ব্যয় করে, বহু আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। এখানে “ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন’ প্রয়োগ হতে পারে। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট লিখিত অঙ্গীকার থাকার পরও  এই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বিপক্ষেয় এক পক্ষ আদালতে গিয়েছে। তাই যারা এতে সংক্ষুব্ধ হয়েছে, তাদেরও সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে আদালতে যাওয়া উচিত।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকার কখনো বলছে, জনগণের রায় অক্ষরে-অক্ষরে পালন করবে। আবার কখনো বলছে, জনগণ না বুঝে গণভোটে রায় দিয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ হ্যাঁ ভোট দিলেও, সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করছে। জুলাই সনদে যেভাবে স্বাক্ষর করা হয়েছে, বাস্তবায়ন না হলে রাজপথে সমাধান হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়ে সংস্কারকৃত সংবিধানের প্রত্যাশা সকল রাজনৈতিক দল প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে জাতির কাছে ওয়াদা করেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে সংস্কারের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে অধিকাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত দিয়েছেন এবং সংস্কারের পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছেন। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি, কাঙ্ক্ষিত জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তালবাহানা করা হচ্ছে। তিনি বলেন এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল, জুলাই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গেও প্রতারণা। বাংলাদেশের মানুষ কোনোভাবেই এই প্রতারণা মেনে নেবে না।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধানে সংশোধন আনতে হবে। সংবিধানে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সংস্কার পরিষদের শপথ বা অন্যান্য বিষয় আসবে। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণের রায়কে সরকার সম্মান করে। তবে আদেশের মধ্যে এমন কিছু প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা জুলাই সনদের রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ ছিল না। চারটি ভিন্ন প্রশ্নের জন্য একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা যৌক্তিক ছিল না। জুলাই জাতীয় সনদ বা সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে যে ‘আরোপিত আদেশের’ কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই।