১৭৩ টাকার তালা ৫,৫৯০ টাকায় কেনা রেলের সেই কর্মকর্তা বেলালের ওএসডি আদেশ বাতিলের তোড়জোড়!

রফিকুল ইসলাম সবুজ:
বাজারে একটি তালার দাম ১৭৩ টাকা; কিন্তু রেলওয়ের জন্য সেটি কেনা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৯০ টাকা দরে। ২৬০ টাকার বালতি কেনা হয়েছিল ১ হাজার ৮৯০ টাকায়, ৬৫ টাকার বাঁশির জন্য বিল দেওয়া হয়েছিল ৪১৫ টাকা, আর ৯৮ টাকার ঝাড়ু কেনা হয়েছিল ১ হাজার ৪৪০ টাকায়। এভাবে  প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম কর্মকর্তা বেলাল হোসেন সরকারসহ সাবেক ও বর্তমান ১৮ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত বছরের ১৫ অক্টোবর মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর পর গত ১৫ মার্চ বেলাল হোসেনকে ওএসডি করে রেলপথ মন্ত্রনালয়। একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ওএসডি হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওএসডি আদেশ বাতিল করতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হুমকির পর তাকে পদায়নের তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে সংস্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এঘটনায় পুরো রেল প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

সংস্লিষ্টরা জানান, বিগত স্বৈরাচারী আমলে আওয়ামী লীগের সাবেক রেল মন্ত্রী মুজিবুল হকের স্ত্রীর আত্মীয় পরিচয়ে এবং পরবর্তীতে সাবেক রেল মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের ছেলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রেল কর্মকর্তা বেলাল হোসেনকে আলোচিত তালাচাবি  দুর্নীতির অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের একজন নেতার তদবিরে তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে আবারও নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে আবারও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয় এবং গত ১৫ মার্চ তাকে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক পদ থেকে ওএসডি করে মহাপরিচালকের কার্যালয়ে সংযুক্ত করে লেপথ মন্ত্রনালয়। এর পর থেকে তিনি ওএসডি আদেশ বাতিলের জন্য নতুন মিশন নিয়ে মাঠে নামেন।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের গত ১৮ জুনের এক প্রজ্ঞাপনে (স্মারক নং: ৫৪.০০.০০০০.০২৩.২৭.০০৩.২৪-৯৯) বেলাল হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়  মালামাল ক্রয়ে বাজারদরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্য অনুমোদন, উন্মুক্ত দরপত্র থাকা সত্ত্বেও নিয়ম ভেঙে সীমিত দরপত্র ব্যবহার করে পছন্দের ৬টি প্রতিষ্ঠানকে কাজ প্রদান ও দরপত্র বিজ্ঞপ্তি গোপন রেখে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বণ্টন এর অপরাধের জন্য তাকে ‘বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক সুবিধা এক বছরের জন্য স্থগিত’ করার লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারির পর থেকে বেলাল হোসেন সরকার নিজেকে ৯০-এর দশকের বুয়েট ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে এই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে তিনি মন্ত্রণালয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। অতীতে ফ্যাসিস্ট মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থেকে অঢেল অর্থ সম্পদ অর্জন করেছেন। ৫ আগস্টের পর আবার রাতারাতি ফ্যাসিস্ট বিরোধী সেজে বৈষম্যবিরোধীর মুখোশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার ও বিপুল অবৈধ অর্থ আয়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি রেল শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের একজন নেতার একটি অডিও ফাঁস হয়েছে, যেখানে বেলালের পক্ষে হুমকি প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়: “বেলালদের হাত অনেক লম্বা।” এছাড়া এই কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, রেল কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ভয় দেখিয়ে এবং অতীতে দেওয়া ‘অনৈতিক সুবিধা’ প্রকাশের হুমকি দিয়ে তিনি অনেককে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন। তার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম কর্মকর্তা (বর্তমানে মহাপরিচালকের কার্যালয়ে সংযুক্ত) বেলাল হোসেন সরকারের ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসআপ এ ম্যাসেজ পাঠালেও কোন জবাব দেননি।

এবিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং ষ্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলার পর তাকে ওএসডি করা হয়েছে। ওএসডি আদেশ বাতিলের জন্য বেলার হোসেন রেলের কর্মকর্তাদের হুমকি দিচ্ছেন এমন কোন অভিযোগ তারা পাননি। তবে তাকে নতুন করে পদায়ন করার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে এমন খবর শোনা যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এর বাইরে তিনি এবিষয়ে আর কোন কথা বলতে রাজি হননি।

##