আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই আমাদের সবার অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত : সাক্ষাৎকারে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ
রফিকুল ইসলাম সবুজ:
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। দেশে দলমত নির্বিশেষে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও কেউ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন আমাদের সবার অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন।
স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রপ্রেমী। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা যুগ যুগ ধরে সংগ্রাম করে আসছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত ন্যায়বিচার, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদা এবং কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভোটের কোনো মূল্য দিত না। অতীতে তারা কখনোই নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব নিতে দেয়নি। সে কারণেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এ দেশের ছাত্র-জনতা ও সৈনিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে নয় মাস সংগ্রাম করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশে আবার একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এ দেশের মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছে। ফলে হাজারো শহিদের আত্মদান অনেকাংশে ব্যর্থ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে আমরা সামরিক শাসনও দেখেছি এবং সর্বশেষ শেখ হাসিনার দলের ১৬ বছরের স্বৈরশাসন দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ওই সময়ে নির্বাচনের নামে কয়েকটি প্রহসনও মঞ্চস্থ হয়েছে।
অবশেষে বাংলাদেশের বীর ছাত্র-জনতা, সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রামের ফলে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের এই গণআন্দোলন কেবল দেশেই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের গুম, খুন ও নির্যাতনের ভয়াবহ সময় পেরিয়ে দেশ এখন একটি মুক্ত পরিবেশে নিশ্বাস নিতে পারছে। ২০২৬ সালে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আশা করি, এখন থেকে গণতন্ত্রকে আর স্বৈরশাসকদের কবলে পড়তে হবে না। এই আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করেই এ দেশের মানুষ ২০২৬ সালে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ এবং সরকার জনগণের সেই আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে। স্পিকার বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নতুন এক যাত্রা শুরু হয়েছে। গুম, খুন ও অসহনীয় নির্যাতনের মতো প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এ দেশের আপামর জনতা রাজপথে নেমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে, যা আজ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। যদিও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে অনেক সময় বিশ্বের পরাশক্তিগুলো খাটো করে দেখতে চায়, তবে গণতন্ত্রের জন্য এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম বিশ্বের ইতিহাসে এক গৌরবের বিষয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন আজ বিশ্বজুড়েই একটি সংকট, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
স্পিকার বলেন, এ দেশের মানুষ বর্তমান সংসদের ওপর অনেক আশা রেখেছে। তারা আগ্রহভরে টেলিভিশনের সামনে বসে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য শোনে এবং সংসদের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার দেখে। জনগণ চায়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার এবং সংসদ সদস্যরা যেন তার প্রতি সুবিচার করেন। আমরা আর কোনো স্বৈরশাসক দেখতে চাই না। আমি আশা প্রকাশ করি যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সরকার দেশের মানুষের জন্য প্রকৃত সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের প্রত্যাশা, দেশে দলমত নির্বিশেষে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও কেউ যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন আমাদের সবার অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আমি সংসদকে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে নিরলসভাবে সচেষ্ট থাকব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকারি ও বিরোধী দল সংসদে একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করবে এবং দেশে মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। স্পিকার হিসেবে আমি সবসময় নিরপেক্ষ থেকে সব দলের প্রতি সমান গুরুত্ব দেব। কারণ সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়; এটি সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গঠনমূলক যুক্তিতর্ক, সমালোচনা এবং জবাবদিহিতার প্রধান কেন্দ্র। যদি সংসদ কার্যকর না হয়, তবে দেশের গণতন্ত্রও শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি রাজনৈতিক সংঘাত, সামরিক শাসন এবং সংসদ বর্জনের মতো নেতিবাচক সংস্কৃতি। এসব কারণে সংসদীয় ব্যবস্থা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে এবং জনগণের মধ্যে সংসদ সম্পর্কে একটি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ দেখতে চায়, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে ঠিকই, কিন্তু গণতান্ত্রিক সৌজন্যবোধ কখনোই নষ্ট হবে না। দীর্ঘ সময় ধরে সংসদ বয়কট করার সংস্কৃতি মূলত গণতন্ত্রকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিরোধী দলের ওয়াকআউট করা গণতান্ত্রিক অধিকারের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু সংসদ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা বা বর্জন করা জনগণের প্রতিনিধিত্বের মূল দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
স্পিকার বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল স্বপ্ন আজও আমরা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভৌগোলিক স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল মূলত ন্যায়বিচার, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদা এবং কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। সেই অর্থে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার প্রধান শর্ত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রায়ই দলীয় সংকীর্ণ বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়, কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কখনোই টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই ছিল জনগণের ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নিশ্চয়তা বিধান করা। বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বেই গণতন্ত্র বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অসহিষ্ণুতা বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়। এই অবস্থায় আমাদের সংসদীয় রাজনীতিকে আরও বেশি দায়িত্বশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করা অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান থাকবে আপনারা সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পথ বেছে নিন। সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই সমান দায়িত্ব হলো সংসদকে কার্যকর রাখা এবং সংসদীয় ব্যবস্থার ওপর জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা। প্রত্যেক পাঁচ বছর অন্তর জনগণের ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার গঠন ও পরিবর্তন হবে; এটাই আমাদের প্রত্যাশা। গণতন্ত্র যদি বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দেশ অবশ্যই সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবে। বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়নের কোনো সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর বিকল্প পথ নেই। আমাদের আগামী দিনের সংগ্রাম হবে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সংগ্রাম এবং অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্বাবলম্বী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশ যত দ্রুত অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারবে, তত দ্রুত বিশ্বের বুকে একটি সম্মানজনক অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।
সংসদীয় গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একে অপরের পরিপূরক। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের একটি শক্তিশালী সংসদ, একটি কার্যকর বিরোধী দল, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় কাজে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই হবে। জনগণ অনেক আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল ও তাদের জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছে। আমরা আশা করব, এই জাতীয় সংসদের সব সদস্য মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের সেই আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবেন।







