সাড়ে ৮ মাসে ঐকমত্য কমিশনের খরচ ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা!
রফিকুল ইসলাম সবুজ:
৬টি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রনয়নের জন্য গঠন হওয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সাড়ে ৮ মাসে ৮৩ কোটি টাকা খরচ করেছে বলে একটি টেলিভিশনের টকশোতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর মন্তব্য করেছেন। তার এ বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে কমিশনের অত্যাধিক ব্যয়ের সমালোচনা শুরু হয়। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে কমিশন এতো টাকা ব্যয় করেনি। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বাজেট ছিল মোট ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাড়ে ৮ মাসে কমিশনের পক্ষ থেকে খরচ করা হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। বাকি টাকা কমিশন ফেরত দিয়েছে। কমিশনে মুলত খরচ হয়েছে আপ্যায়ন খাতে। তাছাড়া কমিশনের সব সদস্য সরকার নির্ধারিত সম্মানীও নেননি বলে জানান তিনি।
ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের পর দেশ পুনর্গঠনে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল সরকার। গত বছরের অক্টোবরে প্রথম দফায় সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুদক এবং পুলিশ সংস্কারে ছয়টি পৃথক কমিশন গঠন করে। গত জানুয়ারিতে কমিশনগুলো প্রতিবেদন জমা দেয়। সংস্লিষ্ট সুত্র জানানয়, এসব কমিশনের কাজ বাস্তবায়নের জন্য গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশনের অনুকূলে ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অনুকূলে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের অনুকূলে ৯৫ লাখ টাকা, পুলিশ সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনায় ৮৩ লাখ টাকা এবং বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৭৬ লাখ টাকা। ৫ কমিশনের জন্য দেওয়া এই বরাদ্দের বাইরে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের একটি জরিপকাজ পরিচালনাতে ব্যয় করা হয়েছিল ৪ কোটি টাকারও বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সম্মানি বাবদ প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। এ ছাড়া কমিশনের জন্য মুদ্রণ, প্রচারণাসহ অন্যান্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা।
জুলাই জাতীয় সনদ প্রনয়নের জন্য এইসব কমিশনের সদস্যদের নিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সংলাপের মাধ্যমে কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ঐকমত্য কমিশন ছয় সংস্কার কমিশনের ১৬৬ সুপারিশ নিয়ে গত মার্চে প্রথম দফার সংলাপ শুরু করে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত সংলাপে ২২ মৌলিক সংস্কারে সংখ্যাগরিষ্ঠে ঐকমত্য ঘোষণা করে কমিশন। মোট ৮৪ সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে প্রণয়ন করা হয় জুলাই সনদ। গত ২৮ অক্টোবর সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশের খসড়া জমা দেয় কমিশন। কমিশনের মেয়াদ শেষ হয় ৩১ অক্টোবর।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি হিসেবে এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফররাজ হোসেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান বিচারপতি এমদাদুল হক ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া কমিশনে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি মনির হায়দার।
ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেওয়া সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক ও নতুন করে সংকট তৈরি হয়। এর পরই কমিশনের সফলতা ও সাড়ে ৮ মাসে কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সাবেক ছাত্রনেতা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর বলেন, ‘নয় মাসে ৮৩ কোটি খরচ করে এখন বলেন রাজনৈতিক দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে তাহলে শুরুতেই বলতেন যে রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর আপনারা আসেন। একটা মতামত আমাদেরকে দেন। পাঁচ দশটা বিষয়ে মতামত দেন। তিনি বলেন, ‘আসিফ নজরুল বলেছেন রাজনৈতিক দলগুলো আপনারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে আসেন। মাঠও নাই পুরোহিতও নাই। এতদিন মাঠ ছিল, ড. ইউনূসের পক্ষে পুরোহিত ছিল আলী রীয়াজ।’ একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে তার এমন বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঐকমত্য কমিশনের খরচ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
তবে ঐকমত্য কমিশনের সংস্লিষ্টদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খরচের যে হিসাব আলোচিত হচ্ছে তা সঠিক নয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ও সদস্যরা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির মর্যাদা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পাবেন বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল। এছাড়া সংস্কার কমিশন প্রধানরাও আপীল বিভাগের বিচারপতির মর্যাদা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পাবেন বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল। আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির মাসিক মূল বেতন এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা। বেতনের পাশাপাশি তারা সরকারি গাড়ি, বাড়ি ও আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিচারকগণ মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে মাসিক বিশেষ ভাতা পান। ফলে ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের মাসে দেড় লাখ টাকার মতো সুবিধা পাওয়ার কথা। তবে ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ কয়েক জন সদস্য অবৈতনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে সংস্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সংসদ সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, কমিশনের কাজে আইন মন্ত্রনালয়ের ৫ জন কর্মকর্তা সার্বক্ষনিক এবং ১০ জন খন্ডকালিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া সংসদ সচিবালয়ের ৯ জন কাজ করেছেন। তাদের বেতন ও ওভারটাইম দিয়েছে আইন মন্ত্রনালয় ও সংসদ সচিবালয়। কমিশন নিজস্ব বাজেট থেকে মুলত দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের আপ্যায়ন এবং সম্মানী খাতে ব্যয় করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বাজেটই ছিল মোট ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাড়ে ৮ মাসে কমিশনের পক্ষ থেকে খরচ করা হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। বাকি টাকা ফেরত দিয়েছে। ফলে ৮৩ কোটি টাকা খরচের বিষয়টি ভিত্তিহীন। উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে এটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটা কোন মহল প্রচার করছে। তিনি বলেন, কমিশনের মুলত খরচ হয়েছে আপ্যায়ন খাতে। কমিশন নিজ হাতে কোন অর্থ খরচ করেনি। কমিশন মুলত প্রধান উপদেষ্টার অধিনে কাজ করেছে। সাচিবিক সহায়তা দিয়েছে আইন মন্ত্রনালয় এবং আইন মন্ত্রনালয়ের ইচ্ছায় সংসদ সচিবালয়। ফলে কমিশন সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ নির্বাহ করেছে এই দুই বিভাগ। কমিশন শুধু তার কি কি দরকার তার চাহিদাপত্র দিয়েছে এবং মন্ত্রনালয় তা ফুলফিল করেছে।
এদিকে সরকারের স্বচ্ছতার কারণে সংস্কার কমিশনের খরচের হিসাব প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, যেহেতু এগুলো সব জনগণের টাকা। ফলে কোন কমিশন কত খরচ করেছে ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এতে করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে অর্থ ব্যয় করেছে তার অডিট হবে নিশ্চয়ই। কমিশনকে সাচিবিক সহায়তা দিয়েছে আইন মন্ত্রনালয় ও সংসদ সচিবালয়। ফলে তাদের কাছে খরচের হিসাব রয়েছে। এর একটা অডিট হবে। কমিশনতো আলাদা করে নিজেরা অডিট করতে পারে না। এটা করলেতো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হয়।
সুত্র: দৈনিক সময়ের আলো
##







