সংসদের এসআইএস মেরামতে গণপূর্তের সাশ্রয় ১৪ কোটি টাকা, চলতি মাসেই প্রস্তুুত হচ্ছে সংসদ ভবন

রফিকুল ইসলাম সবুজ:
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে হাজারো মানুষ। এ সময় তারা অধিবেশন কক্ষ, শপথকক্ষ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদ উপনেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের কক্ষসহ নয় তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষই তছনছ করে। অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেমসহ এমপিদের বসার বেশ কিছু আসন ও টেবিল ভেঙে ফেলা হয়। তছনছ করা হয় সংসদ ভবন এলাকায় ভিআইপি ও এমপিদের বাসভবনও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি থাকলেও সংসদ ভবনের মেরামত কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্টরা জানান, বরাদ্দকৃত প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় ডিসেম্বরের মধ্যে মেরামত কাজ শেষ করার নির্দেশনা থাকলেও তা করা যায়নি। তবে নির্বাচনি তফসিলের পর দ্রুতগতিতে কাজ চলায় চলতি মাসের মধ্যেই সব কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সবকিছু ঠিক থাকলে মার্চ মাসের প্রথম দিকে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে পারে। ভোটের পর ১৪ অথবা ১৫ ফেব্রুয়ারি নতুন এমপিদের শপথ এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই হিসাবে ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সংসদ ভবনের ভেতরে শপথকক্ষ, ভিআইপিদের অফিসকক্ষ এবং সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলোর পাশাপাশি সংসদ অধিবেশন কক্ষের মেরামত কাজ শেষ করতে হবে। তবে ইতিমধ্যে স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অফিসকক্ষের মেরামত কাজ শেষ করে তা ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করা হলেও সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষ এবং অধিবেশন কক্ষ ও শপথকক্ষের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। এ ছাড়া সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের অফিসকক্ষ ও হুইপদের অফিসকক্ষের কাজও শেষ হয়নি।

গণপূর্ত ই/এম বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম নষ্ট করা হয়েছিল। টেবিলের ওপর থাকা মাইক্রোফোনগুলো ভেঙে ফেলা হয়। সাইমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটিশন সিস্টেম (এসআইএস) এবং অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেমের মেরামত কাজ শেষ হয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানান, সাউন্ড সিস্টেমসহ এসআইএস নতুন করে বসাতে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা খরচ হতো। তবে প্রকৌশলীরা এটা সংস্কার করার কারণে মাত্র ৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, অর্থাৎ সরকারের প্রায় ১৪ থেকে ১৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

সংসদ ভবনের দায়িত্বে থাকা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাহিদ পারভেজ বলেন, সংসদ ভবনের ভেতরের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাজ তারা ইতিমধ্যে শেষ করেছেন। বাকি কাজ চলতি মাসের মধ্যেই শেষ করা হবে। তিনি বলেন, অধিবেশন কক্ষের কাজ প্রায় শেষ, ছোটখাটো কিছু কাজ বাকি রয়েছে। আর শপথকক্ষের কাজ আগামী ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে। সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষসহ ভিআইপিদের অফিসকক্ষের কাজ জানুয়ারির মধ্যেই শেষ হবে।

গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে অধিবেশনসহ সংসদের সব কার্যক্রম যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে করা যায় সে লক্ষ্যে মেরামত ও ক্রয় কার্যক্রম জরুরি ভিত্তিতে শেষ করতে গত বছরের মার্চ মাসে গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছিল সংসদ সচিবালয়। সেই নির্দেশনার আলোকেই কাজ চলছে। সংসদ অধিবেশন কক্ষে এমপিদের বসার ২৭টি চেয়ার পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। সামনের সারির বেশিরভাগ টেবিলই ভেঙে গেছে। এগুলো নতুন করে বানানোর কাজ চলছে। কার্পেটের কিছু অংশে আগুন দেওয়া হয়েছিল বিধায় কার্পেটও নতুন করে বসাতে হয়েছে।

গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মেরামত কাজের জন্য চলতি অর্থবছরের বরাদ্দের টাকা ছাড় না হওয়ায় কাজ পুরোপুরি শেষ করা যাচ্ছে না। তবে এপিপির অর্থ দিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। লাইট, কাঠের কাজ ও সিভিল কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থিত মন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের কার্যালয় এবং কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বাসভবনও ভাঙচুর করা হয়।

এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন কম্পিউটার, আসবাবপত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ ও দামি জিনিসপত্র লুট করে। সম্প্রতি কর্মকর্তাদের বাসভবন সংস্কার করা হয়েছে। এমপিদের অফিস হিসেবে ব্যবহার হওয়া পুরাতন এমপি হোস্টেলের ১ নম্বর ব্লকের কাজ শেষ হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ চলছে। এ ছাড়া সচিব হোস্টেল ও এমপিদের বাসভবন ন্যাম ফ্ল্যাটের মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। ১৯২ জন এমপির অফিসকক্ষের এসিসহ মেরামতের জন্য গণপূর্ত ই/এম বিভাগের বিশেষ চাহিদা মোট ২৫ কোটি টাকা। তবে এখনও বরাদ্দ ছাড় না হওয়ায় কাজ পুরোপুরি শেষ করতে পারছেন না বলে কর্মকর্তারা জানান।

গণপূর্ত বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও স্পিকারের কার্যালয় আগে প্রস্তুত করা হয়েছে। এর পরই শপথকক্ষ ও অধিবেশন কক্ষ ঠিক করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি দলের সভাকক্ষ ও বিরোধী দলের সভাকক্ষ, হুইপসহ ভিআইপিদের অফিসকক্ষ ও সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের অফিসকক্ষ ঠিক করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫ আগস্টের পর ন্যাম ফ্ল্যাটে কিছু লোক অবৈধভাবে বসবাস শুরু করেন। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদেরও বসবাস করতে দেওয়া হয়। তবে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা হওয়ার পর সংসদ সচিবালয় থেকে বসবাসকারীদের ন্যাম ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অধিকাংশ অবৈধ বসবাসকারী ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার পর মেরামত কাজ শুরু করেছে গণপূর্ত বিভাগ। একই সঙ্গে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারসহ ভিআইপিদের বাসভবন সংস্কারের কাজ চলতি মাসের মধ্যেই শেষ করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বুধবার সরেজমিন সংসদ ভবনে দেখা যায় সংসদের ভেতরে ধোয়া-মোছা থেকে শুরু করে ভিআইপিদের অফিসকক্ষের মেরামত কাজ চলছে। প্রায় অচল হয়ে পড়া ভবনটিকে আবারও সচল ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় ফিরিয়ে আনতে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। একাধিক কর্মকর্তা জানান, সংসদ ভবন ও সংসদের আবাসিক স্থাপনায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংসদ সচিবালয়ের নিজস্ব খাতের ক্ষতি হয় ৫০ কোটি টাকার। অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি টাকা।

সংসদ সচিবালয়ের আইটি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাদের নিজস্ব বাজেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু কম্পিউটার কিনে স্বল্প পরিসরে কাজ শুরু করা হয়েছিল। গত অর্থবছরে গণপূর্ত সিভিলের বিশেষ এই মেরামত কাজের জন্য ২৮ কোটি টাকা চাহিদা দেওয়া হয়েছিল। তবে বরাদ্দ না পাওয়ায় বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (এপিপি) বরাদ্দ থেকে জরুরি মেরামত কাজগুলো করা হয়।

শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাহিদ পারভেজ জানান, সংসদ ভবন এলাকার রাস্তা সংস্কারসহ বিশেষ মেরামত কাজের জন্য চলতি অর্থবছরে সিভিলের বরাদ্দ ১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এপিপির মাধ্যমে কিছু কাজ শেষ করায় এবারের বরাদ্দ কম চাওয়া হয়েছে। ভোটের আগেই সংসদ ভবনের ভেতরে এবং বাইরের যাবতীয় মেরামত কাজ শেষ করা হবে বলে জানান তিনি।