তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান দেশের অর্ধেক মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেতে পারে বলে জানা গেছে এক জনমত জরিপে। একই জরিপ অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট পেতে পারে ৩১ শতাংশ ভোট। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে দেখতে চান ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্ভাব্য মনে করছেন ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ।

শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে ইনোভেশন কনসালটিং পরিচালিত ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে’-এর তৃতীয় পর্বের তথ্য প্রকাশ করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার এখনও ঠিক করেননি, তারা কাকে ভোট দেবেন। তাই শেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের অবস্থানের ওপর নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি সারাদেশে বিপুলসংখ্যক স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতির কারণে অনেক আসনে একই দলের ভোট ভাগ হয়ে ফলাফলে বড় ধরনের ভিন্নতা আসতে পারে বলেও জরিপ বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ইনোভেশন কনসালটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জরিপের প্রধান মো. রুবাইয়াত সারোয়ার। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক শফিকুল রহমানসহ বিশিষ্টজন। এই জরিপে ১৬ থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের সব বিভাগের গ্রাম ও শহর মিলিয়ে ৫০০টি প্রাথমিক নমুনা এলাকা থেকে মোট পাঁচ হাজার ১৪৭ জন ভোটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। জরিপটি টেলিফোনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এতে অংশ নেন আগের দুই পর্বে জরিপে যুক্ত ভোটারদের মধ্য থেকে দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্বাচিত উত্তরদাতারা। এতে বরিশাল বিভাগের ৬ দশমিক ১ শতাংশ, চট্টগ্রামে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, ঢাকায় ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, খুলনায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ১২ দশমিক ২ শতাংশ, রংপুরে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সিলেটে ৭ দশমিক ১ শতাংশ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ, নারী ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ।

মো. রুবাইয়াত সারোয়ার বলেন, এই জরিপের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের মনোভাব ও রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার হার তত বাড়ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের ৯৩ দশমিক ৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দেবেন। আগের পর্বে যারা ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তাদের ৯৬ শতাংশ এবারও ভোট দিতে চান। এমনকি যারা আগে ভোট দেবেন না বলেছিলেন বা সিদ্ধান্তহীন ছিলেন তাদের ৭৮ শতাংশ ও যারা সিদ্ধান্ত নেননি তাদের ৮৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবার ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এতে ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন, তবে তাদের ২২ শতাংশ গণভোট সম্পর্কে জানেন না।

জরিপে দেখা গেছে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে– এমন আস্থা আগের চেয়ে বেড়েছে। ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে। স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থা রয়েছে ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়েও ইতিবাচক ধারণা পাওয়া গেছে। ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা নিরাপদ পরিবেশে ভোট দিতে পারবেন।

নিজ নিজ এলাকায় কোন দলের প্রার্থী জিততে পারেন– এই প্রশ্নে ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপি প্রার্থীর নাম উল্লেখ করেছেন। প্রায় এক-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন। আগের পর্বের তুলনায় বিএনপির সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে উল্লেখের হার বেড়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে উল্লেখের হার কিছুটা বেড়েছে, যদিও তাদের ভোটব্যাংকে তুলনামূলকভাবে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে।

ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী কে হবেন– এ প্রশ্নে জরিপে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। তবে ২২ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা এখনও নিশ্চিত নন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভোটারদের দ্বিধা এবং শেষ মুহূর্তের পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে।

জরিপে দেখা গেছে, ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা কোন দলকে ভোট দেবেন, সে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগের পর্বগুলোর তুলনায় এটি বেশি। তবে নারী ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। ভোট পছন্দের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপি তাদের মূল সমর্থন ধরে রেখেছে এবং আগে সিদ্ধান্তহীন ও অনির্ধারিত ভোটারদের বড় একটি অংশকে নিজেদের দিকে টানতে পেরেছে। অন্যদিকে আগের আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন, জামায়াতকে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ এম. শাহান বলেন, এবারের নির্বাচন প্রথাগত বিএনপি-আওয়ামী লীগ নির্বাচন নয়, বরং এটি বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনের রূপ নিয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া তিনটি পর্বেই ৩০ শতাংশ ভোটার এখনও কাকে ভোট দেবেন, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। এই বৃহৎ অংশটিই মূলত শেষ মুহূর্তের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতার হার অনেক বেশি।