সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন বিধান যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই

রফিকুল ইসলাম সবুজ:
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশে অন্তর্বর্তীকালিন সরকারকে নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে গণভোট আয়োজনের কথা বলেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এছাড়া সংসদের প্রথম ৯ মাসে (২৭০ দিন) সংবিধান সংস্কার পরিষদ সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কমিশনের এই সুপারিশের তীব্র সমালোচনা করেছেন আইনবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সংক্রিয়ভাবে সংবিধানে কোন বিধান যুক্ত করার সুপারিশ সংবিধান সম্মত নয় এবং অবাস্তব। আর এটা হওয়ারও কোন সুযোগ নেই। ঐকমত্য কমিশনের এধরনের সুপারিশ জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করার সামিল। কমিশন অবাস্তব বিভিন্ন সুপারিশ দিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেও মনে করেন কেউ কেউ।

বিশ্লেষকরা বলছেন. একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন হয়। সংসদকে এড়িয়ে কোনো প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হলে তা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিপন্থী। সংবিধানের মতো মৌলিক ও স্থায়ী আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হওয়া একটি অস্বাভাবিক পদ্ধতি। একারনে সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে এই ধরনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পদ্ধতি আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের এখতিয়ার রয়েছে, ভবিষ্যতে যা এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তাছাড়া ঐকমত্য কমিশনকে এই ধরনের সুপারিশ দেওয়ার কোন ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কমিশনকে সুপারিশ করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা বলতে পারে না ২৭০ দিনের মধ্যে করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার সময়ও কিন্তুু কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়নি।

সুুপ্রিম কোর্টের আইনীজীবী ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসিম বলেন, অনেক বিষয় আছে যেগুলো ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা হয়নি তাও বাস্তবায়ন সুপারিশে আনা হয়েছে। কোন বিধান স্বয়ংক্রীয়ভাবে সংবিধানের অংশ হবে এমন সুপারিশ দিয়ে কার্যত জাতীয় সংসদ ও সবিধান সংস্কার পরিষদকে অবমাননা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম গণভোটে পাস হওয়ার পর সুপারিশগুলো স্বয়ংক্রীয় ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলো। কিন্তুু পরবর্তীতে যদি কোন দল বা জোটের সংসদে দুই তৃতীয়ংশ আসন থাকে তাহলে তারাতো চাইলে ঐ সংশোধনী মুহুর্তের মধ্যেই বাতিল করে দিতে পারে। তাই গায়ের জোরে কোন কিছু চাপিয়ে দিলে তা বাস্তবায়ন হবে না বরং জটিলতা বাড়বে। কারণ সংসদই পারে আইন তৈরি করতে এবং তা বাতিল করতে। এবিষয়ে কারো কোন দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। সুপ্রিমকোর্টের এই আইনজীবী বলেন, আইন অনুযায়ী বর্তমান কোন সংসদ ভবিষ্যত কোন সংসদকে কোন কিছুতে আইন করে বাধ্য করতে পারে না। এটা করলে সংসদের সার্বভৌমত্ব থাকে না। গণভোটের অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তিনি বলেন, ধরুন গণভোটে ৮০ শতাংশ ভোটে সনদ অনুমোদন হলো। আর ৪০ শতাংশ ভোটে দুই শ’ আসন পেলো কোন দল। তাহলে ঐ দল চাইলেই গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে। ফলে গণভোটে অনুমোদন হলেই কিন্তুু কোন লাভ হচ্ছে না। এখন যদি সনদ বাস্তবায়ন হয় বা গণভোট হওয়ার পর এর আইনী বৈধতা নিয়েও কিন্তুু যে কেউ সুপ্রিম কোর্টে আসতে পারে। ফলে এগুলো নিয়ে কিন্তুু ভবিষ্যতে অনেক বিতর্ক তৈরি হবে।

সুুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনীজীবী আহসানুল করিম বলেন, ২৭০ দিন পর সংক্রিয়ভাবে সংবিধানে কোন বিধান যুক্ত করার সুপারিশ বাস্তবসম্মত নয়। কারণ সংবিধানের মৌলিক কোন সংশোধনের বিষয় থাকলে তা সংসদে উত্থাপনের পর দুই তৃতীয়াংশ মেজরিটিতে পাস হতে হবে এবং তার পর তা রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে অনুমোদনের জন্য। তখন রাষ্ট্রপতি গণভোটে পাঠাবেন। এর বাইরে কোন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোন একটি বিষয় সংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে সেটা সংবিধান অনুমোদন করে না। ঐকমত্য কমিশন যে সুপারিশ করেছে তা অবাস্তব। সংবিধানে কোন কিছু সংশোধন, বা অন্তর্ভুক্ত করতে হলে সংসদের দুই তৃতীয়াংশ ভোটে অনুমোদন ছাড়া কোন ভাবেই সম্ভব নয়।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সুপারিশের সমালোচনা করে বরেন, নির্বাচনের পরে ৯ মাসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করার কথা বলা হয়েছে। গণভোটের ম্যান্ডেটের পরও সেই সংসদ যদি এই সংশোধনীগুলো বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ৯ মাসের মাথায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সবকিছু করিয়ে ফেলা যায় না, এই বাস্তবতা মাথায় নিয়ে আমাদের কর্মপদ্ধতি ঠিক করা উচিত। যদি স্বয়ংক্রীয় ভাবেই সুপারিশগুলো সংবিধানে যুক্ত করা যায় তাহলে সংসদে অনুমোদনের কথা বলার আর দরকার কি ছিলো। গণভোটের যদি এতোই পাওয়ার থাকে তাহলে সংসদ বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ এর অনুমোদনের নাটক করার কি দরকার। সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করে দিলেইতো হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার নামে ঐকমত্য কমিশন এতো দিন নাটক করেছে মন্তব্য করে জাহেদ উর রহমান বলেন, সংস্কার কমিশনগুলো যে সুপারিশ করেছে সেগুলোর মধ্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো একজায়গায় করে গণভোট দিয়ে দিলেইতো হয়ে যেত। এতো দিন দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার তাহলে কি দরকার ছিলো। জনগন যদি ‘না’ ভোট দেয় তাহলে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের দরকার কি হবে না। সব মিলিয়ে ঐকমত্য কমিশন বিষয়টিকে বিতর্কিত ও জটিল করেছে। কমিশন নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলোকে চাপিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদে যা কিছুই থাকুক না কেন সব কিছু নির্ভর করবে পরবর্তী সংসদ কি সিদ্ধান্ত নেবে তার ওপর। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমতো সরকার গণভোটের আয়োজন করতে গেলে অনিবার্যভাবেই দেশে রাজনৈতিক অনৈক্য, এমনকি সংঘাত তৈরির পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ৯ মাসের মধ্যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনুমোদন না দিলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাওয়ার সুপারিশকে অবাস্তব মন্তব্য করে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ২৭০ দিন পর যদি আপনাআপনি হয়ে যায়, তাহলে এতো আলোচনার কি দরকার ছিলো। তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে কীভাবে গণভোট, তা তার বোধগম্য নয়। কারণ জুলাই সনদে এতগুলো ধারা যে সেখানে কীসের ভিত্তিতে মানুষ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবে। এসব ধারা বাস্তবসম্মত নয়। এগুলো কেউ পড়বে না। না পড়ে, না বুঝে কীভাবে মানুষ জবাব দেবে এটা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, কোনো জটিল ও দুর্বোধ্য প্রস্তাবের ওপর গণভোট জনগণের প্রতি অবিচার করার শামিল। জটিল বিষয়ে মতামত জরিপে প্রকৃত ফলাফল আসে না। তার মতে, এই গণভোট সঠিক হবে না। কারণ প্রশ্নটি পড়ে বা বুঝে মতামত দেওয়া মানুষের সংখ্যা ২০ শতাংশ আছে বলে মনে হয় না।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ মঙ্গলবার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেন, আগামী সংসদ নিয়মিত কাজের পাশাপাশি প্রথম ২৭০ দিন (৯ মাস) সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবগুলো এই সময়ের মধ্যে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। সনদ বাস্তবায়নে এমন সুপারিশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে যদি সংসদ তা করতে ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশন একটি বিকল্প প্রস্তাবও করেছে। তা হলো সংবিধান-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো খসড়া বিল (সংবিধান সংশোধনী আইনের খসড়া) আকারে তৈরি করবে সরকার। বিলটি গণভোটে দেওয়া হবে। গণভোটে তা পাস হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ মূল ভাব ঠিক রেখে প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করবে। আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ২৭০ দিনের মধ্যে তা অনুমোদন না করলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে।

##